Sunday, October 18, 2020

বিদ্যাসাগর - নবজাগরণ প্রয়াস, কর্মাটাঁড় ও বর্তমান অবস্থান: শাশ্বতী নন্দ

 বিদ্যাসাগর- নবজাগরণ প্রয়াস, কর্মাটাঁড় ও বর্তমান অবস্থান


শাশ্বতী নন্দ


(মেদিনীপুর সমন্বয় সংস্থা, কলকাতা, উন্মুক্ত উচ্ছ্বাস পত্রিকা, নিউ দিল্লি ও বেঙ্গল এসোসিয়েশন, নিউ দিল্লি'র পক্ষ থেকে শ্রদ্ধার্ঘ্য)

 

উনিশ শতকের শুরুর দিকে ঈশ্বরচন্দ্রের জন্মের কিছু আগে থেকেই বাঙালি সমাজের অচলায়তন কিছুটা হলেও সচল হতে শুরু করেছিল। “আধুনিক সভ্যতার ঘাতপ্রতিঘাতে ভারতীয় সমাজের আর নিশ্চল থাকবার উপায় রইল না- কলকাতায় ও তার কাছাকাছি ইংরেজ কেন্দ্রে চক্ষের উপর তারা দেখতে পেল আধুনিক সভ্যতার দুর্জয় রূপ- রাষ্ট্রে, বাণিজ্যে, লুণ্ঠনে, বেপরোয়া শক্তিমান শাসক পুরুষদের দৃপ্ত আবির্ভাব- কী তাদের যুদ্ধশক্তি, সংগঠনশক্তি, নির্মম কর্মশক্তি, দানবীয় ক্রূরতা খলতা, এবং সেই সঙ্গেই সৃষ্টিশক্তি, জ্ঞানের পিপাসা।” রাজা রামমোহন রায়ের হাত ধরে সূচিত হল সেই চলমানতার প্রকাশ্য প্রয়াস। বালক ঈশ্বরচন্দ্র ১৮২৯ সালের মাঝমাঝি যখন কলকাতায় এলেন সেই বছরের শেষেই সতীদাহ প্রথা আইনত নিষিদ্ধ হল, ততদিনে শুরু হয়ে গেছে ডিরোজিও তথা ইয়ংবেঙ্গল পর্ব। ‘জ্ঞানান্বেষণ’, ‘বেঙ্গল স্পেকটেটর’- ইয়ংবেঙ্গলের এইসব পত্রপত্রিকা, পরবর্তীকালে ১৮৩৯ সালে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত ‘তত্ত্ববোধিনী সভা’, ১৮৪১ সালে শুরু অক্ষয়কুমার দত্ত সম্পাদিত ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’ জাতীয় কাগজ এইসব সংস্কার প্রয়াসকে আরও প্রগতিশীল করায় সামিল হল। এইসময়েই সংস্কৃত কলেজের কৃতি স্নাতক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর অক্ষয়কুমার দত্তের সঙ্গে পরিচিত হন আর ‘তত্ত্ববোধিনী সভা’য় যোগদান করেন। সমকালীন শ্রদ্ধেয় এমনই অনেক সংস্কারপ্রয়াসী মানুষদের ও তাঁদের এইসব চিন্তাধারা কাজকর্মের মধ্যে তবু বিদ্যাসাগর সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও বিশিষ্ট।

আসলে বিপুল পাণ্ডিত্য, সুবিপুল মানবতা, অর্থ সামর্থ্য ধৈর্য শ্রম, বাস্তবচেতনা সব নিয়ে তিনি শুধু কথায় নয়, নিজেকে সার্বিকভাবে নিয়োজিত করেছিলেন বিভিন্ন সমাজসংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কর্মযজ্ঞে। বিদ্যাসাগর সম্বন্ধে গান্ধীজীর মূল্যায়নও তাই এমনই- “Beginning with Ram Mohan Roy, one heroic figure after another raised Bengal to a position higher than that of the other provinces. It can be said that Ishwarchandra Vidyasagar was the greatest among them.”।

 

তাঁর জীবদ্দশায় সর্বাধিক আলোচিত ও আলোড়নসৃষ্টিকারী সংস্কারপ্রয়াসগুলি হল বিধবাবিবাহ আইনসিদ্ধ ও প্রচলন করা, হিন্দু কুলীনদের মধ্যে বহুবিবাহ প্রথা রোধের চেষ্টা, নারীশিক্ষার প্রসার, প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট শিক্ষানীতি প্রনয়ণ, শিক্ষক-শিক্ষণ প্রণালী স্থির করা ও বিদ্যালয় স্থাপন। অক্লান্ত একাগ্র উদ্যোগে তিনি বিভিন্ন সমাজসংস্কারের পক্ষে তাঁর নিরলস ক্ষুরধার ওজস্বী লেখনীতে পুস্তক-পুস্তিকা প্রকাশ করেছেন, তাদের প্রচারের ব্যবস্থা করে জনমত গঠনের চেষ্টা করেছেন, বিশিষ্ট পণ্ডিত মানীগুণি ধনী ব্যক্তিদের সম্মতি সম্বলিত আবেদনপত্র সরকারের কাছে পাঠিয়ে তা আইনসিদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। এখানেই শেষ নয়, সফল হওয়ার পরও সেইসব সংস্কারকে সামাজিক ক্ষেত্রে কার্যকরী করতে নিরলস ব্যাপৃত থেকেছেন। এছাড়াও ব্যক্তিগত ঋণবদ্ধ আর্থিক বিনিয়োগের ঝুঁকিতে বাংলা হরফের নির্ভরযোগ্য প্রকাশন ও মুদ্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন ‘সংস্কৃত যন্ত্র’ নামের ছাপাখানার মাধ্যমে, যা সেদিনের নিরিখে এক বৈপ্লবিক উদ্যোগ। নিরপেক্ষ রাজনৈতিক সংবাদপত্র সাপ্তাহিক ‘সোমপ্রকাশ’-এর পরিকল্পনা ও রূপায়ণ করেছেন। বিদ্যাসাগরের আর একটি উল্লেখযোগ্য দূরদর্শী ও লোকহিতৈষী প্রয়াস হিন্দু ফ্যামিলি অ্যানুইটি ফাণ্ডের (সমবায়িক ধরণের) পরিকল্পনা ও স্থাপনা এবং তার মধ্য দিয়ে পারিবারিক নিরাপত্তা ও আর্থিক উন্নয়নের ব্যবস্থা করা। যদিও এই সংস্থার সঙ্গে খুব বেশিদিন সংযুক্ত ছিলেন না তিনি, তবু সমবায়ভিত্তিক আন্দোলনের মত জীবনমুখি ও সমাজকল্যাণকর কর্মধারার পরিকল্পনা ও বাস্তব প্রয়োগ, দুয়েতেই তিনি সুদূরপ্রসারী ছাপ রেখে গেছেন।

তাঁর বহুধাবিস্তৃত কর্মকাণ্ডের এই সুবিপুল শ্রম ছাড়াও কলকাতায় ধারাবাহিক নিরবচ্ছিন্নতায় দর্শনার্থী, অর্থী-প্রার্থীর আসা যাওয়ায় তাঁর ব্যক্তিগত বা বিশ্রামের কোনো সময় ছিল না। অবিশ্রান্ত কাজের চাপে শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তির কিছুটা হয়তো দূর হত মাঝেমধ্যে জন্মভূমি বীরসিংহে গিয়ে ছোটোবেলার পরিবেশ ও আত্মীয়স্বজন সান্নিধ্যে। কিন্তু ১৮৬৯-এ বীরসিংহে আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে মনোমালিন্যে চিরকালের জন্য জন্মভূমি ছেড়ে আসা, তথাকথিত বহু শিক্ষিত মানুষের তঞ্চকতা, অভাবনীয় প্রতারণা, এই সবকিছু মিলে তাঁর মানসিক শান্তি ও শারীরিক অবস্থা দুয়েরই ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছিল। এছাড়া ১৮৬৬-তে ঘোড়ার গাড়ি দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর তিনি কোনোদিনই পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি।

এমনই এক অবসাদগ্রস্ত অবস্থায় ১৮৬৯-এর নভেম্বরে মা-কে লিখলেন, “পূজ্যপাদ শ্রীমন্মাতৃদেবী শ্রীচরণারবিন্দেষু প্রণতিপূর্ব্বকং নিবেদনম্‌- নানা কারণে আমার মনে সম্পূর্ণ বৈরাগ্য জন্মিয়াছে, আর আমার ক্ষণকালের জন্যেও সাংসারিক কোন বিষয়ে লিপ্ত থাকিতে বা কাহারও সহিত কোন সংস্রব রাখিতে ইচ্ছা নাই। ...” এই বিষয়ে এর দু-সপ্তাহ পরে প্রায় একই বয়ানে পিতৃদেবকে লিখলেন “...সকলকে সন্তুষ্ট করিবার নিমিত্ত প্রাণপণে যত্ন করিয়াছি, কিন্তু অবশেষে বুঝিতে পারিয়াছি সে বিষয়ে কোন অংশে কৃতকার্য্য হইতে পারি নাই।...” এরপর তাঁর প্রাণপ্রিয় জন্মভূমি বীরসিংহে আর কখনও তিনি পদার্পন করেননি, যদিও ১৮৯১-এ তিরোধানের কিছু বছর আগে আবার বীরসিংহে যাওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশ করলেও ব্যস্ততা এবং অসুস্থতার কারণে আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি। অথচ সেখানে প্রতিষ্ঠিত যাবতীয় জনকল্যাণমূলক কাজের সুব্যবস্থা ও আর্থিক দায়ভার তিনি আজীবন, এমনকি মৃত্যু-পরবর্তী উইলেও বয়ে গেছেন।

যখন তাঁর শরীর মনের এমন অবস্থা, ডাক্তাররা হাওয়া বদলের পরামর্শ দিচ্ছিলেন। স্বাস্থ্যকর নির্জন জায়গায় একটি বাসস্থানের সিদ্ধান্ত নিয়ে বেশ খোঁজাখুজির পর ১৮৭৩-এ এক ইংরেজ মহিলার কাছ থেকে মধুপুর আর জামতাড়ার মধ্যে কর্মাটাঁড়ে একটি পুরোনো বাড়িসহ তিন একর উনিশ শতক জমি কিনে তার ওপর নতুন করে, মনের মতো বাড়ি তৈরি করলেন, বাগান সাজালেন। নাম দিলেন ‘নন্দনকানন’। উল্লেখ্য যে এসময়ের আগে থেকে তাঁর মা-বাবা বারাণসীতে গিয়ে সেখানে ছিলেন, যদিও এর দুবছর আগেই ১৮৭১-এ মা ভগবতী দেবী লোকান্তরিত হয়েছেন। তবে কাশীর পরিবেশ তাঁর মনের অনুকূল ছিল না, বিশেষত সেখানকার বাঙালি ব্রাহ্মন সম্প্রদায়ের সংগে তাঁর মনান্তর সর্বজনবিদিত। তাই কলকাতার ক্লান্তি থেকে কর্মাটাঁড়ের অনাবিল সবুজ প্রকৃতি আর সাঁওতাল, কৃষিজীবি মানব প্রকৃতির মধ্যেই ছিল তাঁর ছুটি, এইই হয়ে উঠল তাঁর বাকি জীবনের বার্ধক্যের বারাণসী। আরও একটা কথা মনে করা দরকার যে জন্মভূমি বীরসিংহকে যাতে ভুলে না যান সে জন্য কলকাতাতেও তিনি নিজের কোনো বাড়ি এতদিন করেননি। এরপরে বাবার অনুমতি নিয়ে ১৮৭৬-এ বাদুড়বাগানে আর একটি বাড়ি করলেন। এই বাড়ি করার সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ হিসেবে বাবাকে লিখেছিলেন, বারবার বাসাবদলে প্রাণপ্রিয় তাঁর ষোল হাজারেরও বেশি বিপুল বইয়ের সম্ভার-সম্পদের হারিয়ে যাওয়া, ক্ষতির কারণে তাদের একটি স্থায়ী বাসস্থানের দরকার হয়ে পড়েছে। তবে কর্মাটাঁড় ছিল যেন বিদ্যাসাগর নামের ভারে চাপা পড়ে যাওয়া সহজ এক আন্তর ঈশ্বরচন্দ্রের খোলা হাওয়ায় মুক্তি। সেখানেও তাঁর প্রকৃতিগত মানবিকতার সমুজ্জ্বল প্রকাশ।

সমাজসংস্কার আন্দোলনকে বিদ্যাসাগর এক সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে দেখেছিলেন। যথার্থ সংস্কার, যথার্থ বিপ্লব যা গঠনমূলক ও স্থায়ী, তার সফলতা অনায়াস বা দ্রুত আসে না। তাই একদিকে যেমন ছিল তাঁর সক্রিয় কর্মজীবনের স্বল্প সময়ে কার্যকরী করে তোলা যায় এমন অনেক উদ্যম তেমনই অন্যদিকে ছিল সমাজের সার্বিক সংস্কারে বেশ কিছু দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। কর্মাটাঁড়েও আমরা দেখি এই একই চিন্তাধারার প্রয়োগ।

কর্মাটাঁড়ে বাড়ি করার পর একটানা খুব বেশি সময় তিনি সেখানে থাকতে পারতেন না, যেসব কাজের সূচনা তিনি করেছিলেন তার দায়িত্ব কর্তব্যে তাঁকে কলকাতা বা আরও অন্যান্য জায়গায় ফিরে ফিরে আসতে হত। তবু স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি কর্মাটাঁড়ে মেয়েদের জন্য স্কুল, বয়স্কদের জন্য নৈশ স্কুল ও হোমিওপ্যাথি দাতব্য চিকিৎসালয় খুলেছিলেন। গরীব মানুষদের আশু প্রয়োজনগুলি তাঁর সাধ্যের বাইরে গিয়ে মেটানোর চেষ্টা করে গেছেন। কখনো তাদের বাড়িতে ডেকে প্রাণভরে খাইয়েছেন, কখনও তাদের না বিক্রি হওয়া ফসল কিনে নিয়ে, সেগুলি দিয়ে তাদেরই ক্ষুণ্ণিবৃত্তির ব্যবস্থা করেছেন। যখন যার যা দরকার হয়েছে দিয়েছেন, যে যা আবদার করেছে সব মেটাতে চেষ্টা করেছেন। কলকাতা থেকে এনেছেন প্রচুর শাড়ি জামাকাপড়, শীত বস্ত্র, নানারকম উপাদেয় খাদ্যসামগ্রী ছাড়াও উন্নত মানের বীজ। ১৮৭৫ সালে বিদ্যাসাগরের ভাই শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন কয়েকদিনের জন্য কর্মাটাঁড়ে গিয়েছিলেন। তিনি এ বিষয়ে লিখেছেন: “তিনি প্রাতঃকাল হইতে বেলা দশ ঘটিকা পর্য্যন্ত, সাঁওতাল রোগীদিগকে হোমিওপ্যাথি-মতে চিকিৎসা করিতেন এবং পথ্যের জন্য সাগু, বাতাসা, মিছরি প্রভৃতি নিজ হইতে প্রদান করিতেন। আহারাদির পর বাগানের গাছ পর্য্যবেক্ষণ করিতেন, আবশ্যকমতে একস্থানের চারাগাছ তুলাইয়া অন্য স্থানে বসাইতেন। পরে পুস্তক-রচনায় মনোনিবেশ করিতেন, অপরাহ্নে পীড়িত সাঁওতালদের পর্ণ-কুটীরে যাইয়া তত্ত্বাবধান করিতেন।” এটুকুতেই বোঝা যায় কর্মাটাঁড়েও স্বভাবসিদ্ধ ব্যস্ততায় কোনো ছেদ পড়েনি এই কর্মবীরের। এখানেও তিনি স্বচরিত্রে বিদ্যমান। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় তিনি যে শুধু বিশ্বাসী ছিলেন তা নয়, নিজেও যথেষ্ট বুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। কর্মাটাঁড়ে তিনি বাড়িতে তো বটেই, দরকার হলে রোগীদের ঘরে ঘরে গিয়ে ওষুধ পথ্য দিয়ে তাদের সারিয়ে তুলেছেন।

এই হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার প্রসারে তাঁর যা অবদান, তাকেও সাধারণের আয়ত্তাধীন এবং বিকল্প এক চিকিৎসা ভাবনার ক্ষেত্রে বলা যায় নবজাগরণের সামিল। ডাক্তার বেরিনি সাহেব কলকাতায় এসে যখন কিছুতেই সফল হতে পারছেন না, সেসময় বিদ্যাসাগরের অনুরোধে তাঁর সুহৃদ রাজেন্দ্র দত্ত মশায় বেরিনি সাহেবের কাছ থেকে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা শেখেন। তবে তাঁর কাছেও শুরুতে কেউই চিকিৎসা করাতে চাননি, বিদ্যাসাগর মশায়ই প্রথমে নিজেকে সঁপে দিলেন এই নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির হাতে। তাঁর বেশ কিছু পুরোনো অসুস্থতা এতে সেরে যাওয়ায়, পরপর অনেকেই ভরসা করে ফল পেলেন। এরপর শুধু তিনি নিজেই শিখলেন তা নয়, রাজেন্দ্র বাবুর মাধ্যমে নিজের মেজো ভাই দীনবন্ধু ন্যায়রত্ন ছাড়াও আরও অনেককে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় সুশিক্ষিত করে তুললেন। এভাবে বহু জায়গায় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার প্রসার হতে লাগল। বিদ্যাসাগর মশায়ের প্রেরণায় দীনবন্ধুবাবু বীরসিংহে এবং রাজেন্দ্রবাবুর আর এক ছাত্র কাশীতে গিয়ে যথেষ্ট পসার লাভ করেন ও নতুন ছাত্রদের তৈরি করতে থাকেন। ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারও বিদ্যাসাগরের কথায় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাকে সাদরে গ্রহণ করেন। নতুন কিছুকে পরীক্ষা করা, উপযুক্ত হলে তাকে সাগ্রহে বরণ করা ও জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া এই ছিল তাঁর এগিয়ে যাওয়ার পথ। তাই তিনি অনুকরণীয়ভাবে চির প্রাসঙ্গিক ও চির আধুনিক। কর্মাটাঁড়ে তাঁর চিকিৎসার মাধ্যমেই বিহারে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা দৃষ্টি আকর্ষণ করে, সেখানেও তিনিই পথপ্রদর্শক।

বিদ্যাসাগর ধর্মসংস্কারক ছিলেন না, ধর্মসংক্রান্ত কোনো নতুন মতবাদও তিনি প্রচার করেননি কিন্তু প্রতিটি ধর্মের যে মূল কথা, বহু সাধনে যা করায়ত্ত করার কথা বলা হয়ে থাকে, সেই নিঃস্বার্থ প্রেমভাব, পরার্থে উৎসর্গীকৃত সহজ নির্লোভ জীবনাচরণ ছিল তাঁর সহজাত। রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগর চরিত্রের এই রহস্য উন্মোচনে বিদ্যাসাগর জননীর মানবিক উচ্চতা সম্বন্ধে বলেন- “বঙ্গদেশের সৌভাগ্যক্রমে এই ভগবতীদেবী এক অসামান্যা রমণী ছিলেন। ... এই রমণীকে কোন শাস্ত্রের কোন শ্লোক খুঁজিতে হয় নাই; বিধাতার স্বহস্তলিখিত শাস্ত্র তাঁহার হৃদয়ের মধ্যে রাত্রিদিন উদ্‌ঘাটিত ছিল। অভিমন্যু জননীজঠরে থাকিতে যুদ্ধবিদ্যা শিখিয়াছিলেন, বিদ্যাসাগরও বিধিলিখিত সেই মহাশাস্ত্র মাতৃগর্ভবাসকালেই অধ্যয়ন করিয়া আসিয়াছিলেন।” তাই তথাকথিত নিম্নশ্রেণী্র মহিলাদের রুক্ষ মাথায় নিজের হাতে তেল মাখিয়ে দিতে বা অন্য ধর্মের শিশুকে কোলে তুলে নিতে যেমন দুশো বছর আগের সমাজে বসেও এই ব্রাহ্মণ পণ্ডিতকে একবারও বিন্দুমাত্র ভাবতে হয়নি, তেমনই কর্মাটাঁড়ে মেথরপল্লীতে গিয়ে কলেরা রোগগ্রস্ত মহিলার চিকিৎসা সেবা্র ভার নিজের হাতে তুলে নিতেও তাঁকে কিছুমাত্র দ্বিধাগ্রস্ত হতে হয়নি। তবু সেই তাঁকেও সমাজজীবনে বদল আনতে প্রচলিত শাস্ত্রবিধির শরণাপন্ন হতে হয়েছে। কারণ ‘তাদের কাছে তো সদ্‌যুক্তি আসল কথা নয়, যা শাস্ত্রে আছে তাই ধর্ম, তাই যুক্তি।’

বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্র থেকে যুগধর্মের বিভিন্নতা সম্বন্ধে বহুবিধ বিশদ আলোচনা করেছেন এই অসামান্য শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত বিধবাবিবাহ সংক্রান্ত তাঁর বই দুটিতে। প্রথম বইটিতে লিখেছেন, “কোন যুগে কোন ধর্ম অবলম্বন করিয়া চলিতে হইবেক, পরাশরপ্রণীত ধর্মশাস্ত্রে সে সমুদয়ের নিরূপণ আছে। পরাশরসংহিতার প্রথম অধ্যায়ে লিখিত আছে-

 

কৃতে তু মানবা ধর্মাস্ত্রেতায়াং গৌতমাঃ স্মৃতাঃ।

দ্বাপরে শাঙ্খলিখিতাঃ কলৌ পারাশরাঃ স্মৃতাঃ।।

 

মনুনিরূপিত ধর্ম সত্যযুগের ধর্ম, গৌতমনিরূপিত ধর্ম ত্রেতাযুগের ধর্ম, শঙ্খনিরূপিত ধর্ম দ্বাপরযুগের ধর্ম, পরাশরনিরূপিত ধর্ম কলিযুগের ধর্ম।”

 

দ্বিতীয় বইটিতে যুগধর্মের ভিন্নতা নিয়ে পরাশরসংহিতা থেকে একটি চমৎকার এবং বর্তমানকালেও প্রণিধানযোগ্য উদাহরণ-

 

“কৃতে সম্ভাষণাদেব ত্রেতায়াং স্পর্শনেন চ।

দ্বাপরে ত্বন্নমাদায় কলৌ পততি কর্ম্মণা।।”

সত্যযুগে সম্ভাষণ মাত্রেই পতিত হয়, ত্রেতাযুগে স্পর্শন দ্বারা পতিত হয়, দ্বাপরযুগে অন্নগ্রহণ দ্বারা পতিত হয়, কলিযুগে কর্ম দ্বারা পতিত হয়।” অর্থাৎ ধর্মবিধির নিরিখে কলিযুগে কোনো সম্ভাষণ, স্পর্শ বা অন্নজল গ্রহণে নয় মানুষ স্বকর্মেই পতিত হয়। চারিত্রিক, মানবিক বা সামাজিক দুর্গুণবিশিষ্ট মানুষকে শাস্ত্রকাররা ‘পতিত’ বললেন। অথচ এই শাস্ত্রনির্দেশের বিপরীতে আমরা ভ্রান্ত শাস্ত্রব্যাখ্যায় দ্বাপরযুগেই পরিত্যক্ত সেই ত্রেতাযুগের কথিত ‘স্পর্শদোষ’ দুষ্ট করে দিলাম নিরীহ অসহায় দরিদ্রদের!

কী মানবিকতায় কী শাস্ত্রজ্ঞানে আসল পতিত কারা সে বিষয়ে বিদ্যাসাগর সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল ছিলেন। তঞ্চক, মিথ্যাচারী, কৃতঘ্ন সেইসব পতিতদের তাই তিনি পরিত্যাগ করেছিলেন নির্দ্বিধায়। অন্ত্যজ প্রান্তিকশ্রেণীর মানুষদের সংস্পর্শে এসে, নিজের হাতে সেবা করে সমাজের তথাকথিত উচ্চশ্রেণীর মধ্যে আলোড়ন আনার সঙ্গে সঙ্গে, নিজেদের নীচু বলে এতদিন বিশ্বাস করে আসা মানুষদের মধ্যেও এনেছিলেন নবচেতনা, ফিরিয়ে দিয়েছিলেন আত্মবিশ্বাস। তাঁর নবজাগরণের প্রয়াস এভাবেই অব্যাহত ছিল তাঁর প্রিয় কর্মাটাঁড়ে। এখানেও বাল্যবিবাহ রোধ, বিধবাবিবাহের উদ্যোগ, নৈশস্কুলের মাধ্যমে দিনমজুর গরীবদের মধ্যে শিক্ষাপ্রসার, ইত্যাদি তাঁর সেই নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াসেরই সাক্ষ্য।

কর্মাটাঁড়ে আর একটি ব্যতিক্রমী কাজ, সাধারণ সাঁওতালদের উন্নত ধরনের চাষবাসে সচেতন করে তোলা। এখানকার কাঁকর মেশানো পাথুরে মাটিকে কিভাবে ‘নন্দনকানন’ করে তোলা যায় তা তিনি শেখাতে চেষ্টা করেছিলেন তাদের। নিজের বাড়ির বাগানে বড় গাছ ছাড়াও নানান মরশুমি শাকসবজি লাগাতেন, সাহায্যের জন্য ডেকে নিতেন সাঁওতাল শ্রমিকদের। অনুর্বর জমিতে কখনও কাঁকর বেছে, কখনও দরকারমতো কয়েক পরত মাটি খুঁড়ে ফেলে ভালো মাটি ঢেলে, ভালো মানের বীজ রোপণ করতেন। দ্বিগুণ পারিশ্রমিক, প্রাকৃতিক দুর্যোগেও পুরো পয়সা- তাই কাজের সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকদের শেখার উৎসাহেও ভাটা পড়ত না। ইংরেজ আমলে শহরায়ন বা রাস্তাঘাট তৈরির জন্য দ্রুত বনজঙ্গল কাটার ফলে প্রাকৃতিক সম্পদে পূর্ণ জঙ্গলের আদি নিবাসীদের জীবন জীবিকার মূলে টান পড়ে। চিরদিন বিনিময় প্রথায় অভ্যস্ত এই সব মানুষদের কাছে টাকা পয়সায় লেনদেন, ইংরেজ শাসন সবই নতুন। ফলে ইংরেজ ও তার সহযোগী জোতদার মহাজনদের খপ্পরে পড়ে ক্রমশ সর্বস্বান্ত হতে থাকে সরল এই মানুষগুলো। ১৯৫৫-৫৬-র সাঁওতাল বিদ্রোহ এরই ফল। ইংরেজের বিরুদ্ধে ভারতে প্রথম গণসংগ্রাম। সেই আন্দোলনকে কী নারকীয়ভাবে পিষে ফেলা হয়েছিল তার ইতিহাস সকলের জানা। তারপরই গঠিত হয় দুমকা জেলা যা সাঁওতাল পরগণা নামে পরিচিত। কর্মাটাঁড় তখন ছিল এই জেলাতেই, অধুনা জামতাড়া জেলায়। ক্রূর ইংরেজের সঙ্গে লড়তে হলে যে প্রথমেই আধুনিক জ্ঞানে-বিজ্ঞানে তাদের সমকক্ষ হতে হবে তা বুঝে ছিলেন বলেই, দেশীয় বিদ্যার সঙ্গে প্রয়োজনীয় পাশ্চাত্য বিদ্যাও শিক্ষাসূচীর অন্তর্ভুক্ত করায় বিদ্যাসাগর আপসহীন ছিলেন। বন্দুক-কামানের মোকাবিলায় তীর-ধনুকে অমূল্য প্রাণের অপব্যয় না চেয়ে পরম দূরদৃষ্টিসম্পন্ন স্থিতধী এই মানুষটি দেশের আদি নিবাসীদের সাংস্কৃতিক নিজস্বতা বজায় রেখে, মূল স্রোতের সঙ্গে অভিযোজিত করতে সচেষ্ট হলেন। বিদ্যালয়, আধুনিক চিকিৎসা, কৃষির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে এক নবজাগরণের সূচনা করলেন এইসব প্রান্তিক মানুষজনের মধ্যেও।

এত চেষ্টা সত্ত্বেও কর্মাটাঁড়ে তাঁর ভালোবাসার মানুষদের নিঃসীম দারিদ্র, দুঃখ-কষ্ট তিনি নির্মূল করতে পারেননি, এই নিষ্ঠুর বাস্তব তাঁকে কাঁদাত। শেষ বয়সে শরীর একেবারে যখন ভেঙে পড়েছে, কলকাতায় একজন তাঁকে কর্মাটাঁড়ে গিয়ে থাকার কথা বললে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, “বাপু, সেখানে গেলে ভালো থাকি বটে। আমার যদি অতুল ঐশ্বর্য থাকত, তাহলে সেখানে গিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে থাকতে পারতাম, শরীর-মন ভালো থাকত। কিন্তু, আমার সে অদৃষ্ট কই? আমার সে ক্ষমতা কই?... দ্যাখো, কার্মাটাঁড়ে একসের চালের ভাত, আধসের অড়হর ডাল, আধসের আলু আর একসের মাংস যে অনায়াসে খেতে পারে, তাকে আজকাল পোয়াটাক ভুট্টার ছাতু খেয়ে থাকতে হয়, তার বেশি আর জোটে না। আমি সেখানে গিয়ে দিব্যি খাওয়া-দাওয়া করব, আর আমার চারদিকে সাঁওতা্লেরা না খেয়ে মারা যাবে দেখব- এ কি সইতে পারি?” বলতে বলতে আকুল হয়ে কেঁদেছিলেন দীননাথ সেই ঈশ্বর।

অন্যদিকে নিঃস্ব এই মানুষগুলো নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে তাদের নিখাদ ভালোবাসা্য ভরিয়ে রেখেছিল বিদ্যাসাগরকে। সেদিনের সেই কর্মাটাঁড়বাসীদের আমাদের হৃদয়ের স্বতোৎসারিত কৃতজ্ঞতা। যা আমরা দিতে পারিনি, তাঁরা তা নিজের অজান্তেই দিয়েছিলেন, ক্লান্ত শ্রান্ত বিদ্যাসাগরকে দু-দণ্ডের শান্তি। আর বিদ্যাসাগরের কাছেও আমরা আভূমি কৃতজ্ঞ, সাঁওতালদের কাছে নানাভাবে তাদের প্রবঞ্চিত করা বাঙালির মলিন ভাবমূর্তিটি তিনি তাঁর চরিত্রের সোনার ছটায় উজ্জ্বল করে তুলতে পেরেছিলেন। সাঁওতালদের কাছে ‘বিদ্যেসাগর’ হয়ে উঠেছিলেন দেবতা। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ভালোবাসার এ এক অপরূপ দৃষ্টান্ত।

কেউ কেউ বলে থাকেন বিদ্যাসাগর শেষ বয়সে মানববিদ্বেষী হয়ে উঠেছিলেন। এ বোধহয় কিছুটা খণ্ডিত দর্শন। কিছু মানুষের স্বভাবে বীতশ্রদ্ধ হয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু মানবপ্রেমের আদর্শ থেকে কখনই তিনি এতটুকুও বিচ্যুত হননি। কর্মাটাঁড় বা তার বাইরের বলয়েও তাঁর জীবনচর্যা, মানবসেবা, সংস্কারকাজের প্রতিটি ঘটনায় তা বিধৃত। বাস্তবে তিনি মানবকল্যাণকর কোনও কিছু থেকে কখনোই সরে আসেননি, যা পরিণত বয়সে এসে সংসারে, সংস্কার কাজে জড়িয়ে থেকে তাঁর মতো মনীষীর পড়াশোনা কিছুই হল না এই অশ্রুসিক্ত আক্ষেপ থেকে স্পষ্ট হয়। বৃদ্ধবয়সে বিদ্যাসাগর একদিন মহেন্দ্রনাথ গুপ্তের কাছে কাঁদতে-কাঁদতে বললেন- “আমার তো খুব ইচ্ছা ছিল যে পড়াশোনা করি, কিন্তু কই তা হল। সংসারে পড়ে কিছুই সময় পেলাম না।” এমনতর মনোবেদনা উচ্চারণ করতে যে অতুলনীয় সারল্য ও নিরহংকার ব্যক্তিত্ব লাগে সেইই তো মহাসাগর- সেইই করুণাসাগর।

কোন প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে তাঁকে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে জিততে হয়েছে তা বুঝতে বিদ্যাসাগর যে সময়ের কাণ্ডারি সেইসময়কার সামাজিক পটভূমি একবার দেখে নেওয়া প্রাসঙ্গিক হবে। তিনি যখন পঞ্চাশ পেরিয়েছেন ১৮৭২-এর প্রথম নথিভুক্ত সরকারী সেই তথ্য অনুযায়ী ভারতে তখন মোট সাক্ষর নাগরিক প্রায় ৩.২৫% আর সাক্ষর নারী- আনুমানিক মাত্রই ০.৩০%। তাঁর তিরোধান সময়ে ১৮৯১-র পরিসংখ্যানে যা সামান্য বেড়ে মোট সাক্ষর প্রায় ৪.৬২%, আনুপাতিক হারে নারী- ০.৪২%, পুরুষ- ৮.৪৪% আর বিংশ শতাব্দীর শুরুতে, ১৯০১-সালে সাকুল্যে সাক্ষর ৫.৪০%, যার মধ্যে নারী- ০.৬০%, পুরুষ- ৯.৮০%। তবে বাংলার নারীকুল তখনও সর্বভারতীয় সেই সীমায় পৌঁছোতে পারেনি, ১৯০১-এর বাংলায় সাক্ষর নারী- ০.৫০% ও পুরুষ- ১০.৪০%। সুতরাং তাঁর কর্মজীবনের মূলপর্যায়ে বাংলায় বা পুরো ভারতেই নারী সাক্ষরতার হার ০.২০% থেকে ০.৩০%-এর মধ্যে ধরে নেওয়া যায়। তাই বিদ্যাসাগরের কর্মজীবন সেই সময়কালে, যখন নিরক্ষরতা দারিদ্র সমাজের মূল চালচিত্র। তার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি জড়িয়ে ছিল অশিক্ষা, অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের সুযোগ নিয়ে ক্ষমতাকে অধিকার করে ফেলা মুষ্টিমেয় কিছু স্বঘোষিত সমাজপিতার বিধি-বিধানের দৌরাত্ম্যে বৃহত্তর মানবগোষ্ঠীর সামাজিক অর্থনৈতিক নিষ্পেষণ।

 

বিদ্যাসাগর আমাদের পথ দেখিয়েছিলেন সাম্যের, সামাজিক সন্তুলনের, সার্বিক উন্নয়নের; সে বীজ এতদিনেও আধুনিক মুক্তমনস্কতার উর্বর জমিতে পূর্ণ পল্লবিত হয়ে উঠল না কেন সে আত্মসমীক্ষা একান্ত প্রয়োজন। আজকের সমাজেও ভাগ্যহত বিধবাদের, বিশেষত আর্থিক সঙ্গতিহীনাদের বিবাহ সাবলীল সামাজিক প্রথা হয়ে ওঠেনি। বাল্যবিবাহ যে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল হয়েছে ঠিক তাও নয়। জাতপাতের অত্যাচার এবং নির্মম নিষ্ঠুরতা প্রতিদিনের খবর।

ব্রিটিশ-ভারতে যাবতীয় প্রতিকূলতার মধ্যেও যুগান্তকারী এইসব সংশোধন আন্দোলনগুলি রূপায়িত হওয়ার শুরুর দিকে ১৯১১-সালে পুরো দেশে গড় সাক্ষরতা ছিল ৫.৯%, যার মধ্যে নারী ১.০% এবং পুরুষ ১০.৬%। আর পুরো এক শতাব্দ পার করে ২০১১-তে সাক্ষর পুরুষ ৮২.১% আর নারী ৬৫.৫%, এখনও এক তৃতীয়াংশ নিরক্ষর। উপার্জনে মেয়েরা প্রায় শূন্য থেকে শুরু করে এক শতাব্দ পরে, এই দশকে ২৫% মাইল-ফলকের কাছাকাছি এসেও, সংবাদপত্র তথ্য অনুসারে ধারাবাহিকভাবে কমে ২০১৮-তে প্রায় ২১.৯%-তে এসে দঁড়িয়েছে। বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা, আইন প্রণয়নের পরেও আজ নারী পুরুষ জনসংখ্যা অনুপাত ৯৪০ : ১০০০। অর্থাৎ শতাব্দব্যাপ্ত আধুনিকতা পার করে ১৯১১-সালের ৯৬৫ : ১০০০-এর তুলনায়, আজ তাদের অনুপাত আরও ২.৫% কম। পুরুষ বনাম মেয়েদের শিক্ষার হার, উপার্জনে নজর কাড়া বৈষম্য, কন্যাভ্রূণ হত্যার কারণে জনসংখ্যায় ব্যাপক অসন্তুলন, ঊর্ধ্বগামী পণপ্রথা- পরিস্থিতি কিছু এমনই। এখনও, এই একবিংশ মঙ্গলায়ন আধুনিকতার শতকেও ‘মেয়ে বাঁচাও মেয়ে পড়াও’ আমাদের জাতীয় আন্দোলন।  তাই আশ্চর্য মনে হয় না যে মেয়েদের পক্ষে সবচেয়ে অনিরাপদ দেশের তালিকায় প্রথম স্থানের কলঙ্কে নেমেছে ভারত। বিদ্যাসাগরের সেদিনের আক্ষেপ “... এই হতভাগ্য দেশে, পুরুষজাতির নৃশংসতা, স্বার্থপরতা, অবিমৃশ্যকারিতা প্রভৃতি দোষের আতিশয্যবশতঃ, স্ত্রীজাতির যে অবস্থা ঘটিয়াছে, তাহা অন্যত্র কুত্রাপি লক্ষিত হয় না।” বা “হা অবলাগণ! তোমরা কি পাপে, ভারতবর্ষে আসিয়া, জন্ম গ্রহণ কর, বলিতে পারি না!”- দুটি কথাই তাঁর দ্বিতীয় জন্মশতবর্ষে এসেও বহুলাংশে সত্য।

আমরা দেখেছি যখন যেখানে বিদ্যাসাগর, তখন সেখানেই নবজাগরণ, তিনিই ঋত্বিক। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে, প্রতিটি আচরণে নতুন চেতনার উন্মেষ আর তাইই নতুন নতুন সামাজিক আন্দোলনের দিকনির্দেশ। তিনি হার্দিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ন্যায়ের দিশারী, উচ্চতম বিবেকের প্রতিভূ। তিনি তাত্ত্বিক নেতা ছিলেন না, সমস্ত অর্থেই তাঁর জীবনই ছিল তাঁর বাণী। যা উচিত, যা কল্যাণকারী নিজের জীবনের একশো ভাগ দিয়ে তা তিনি করে গেছেন। তাঁর সে যজ্ঞবহ্নি ধারণ করার, বহন করার দায়বদ্ধতা বাকিটুকু আমাদের।

আদ্যোপান্ত স্বদেশী গরিমায় উজ্জ্বল যোগীসুলভ সাদা উড়ুনি সাধারণ চটি পরা এই অসমসাহসী মানবদরদী ‘এদেশে প্রথম আধুনিক মানুষ’টি আমাদের বুঝিয়ে গেছেন- আধুনিকতার, প্রগতিশীলতার প্রকৃত পরিচয় সামাজিক সাম্যের মমতাময় স্থিরসঙ্কল্পে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের সম্পদ আহরণ এবং সাধারণ্যে তার বুনিয়াদ গড়ে তোলার দৃঢ়সিদ্ধান্তে। দু-শতক প্রাচীন তিনি এখনও অনেকটাই এগিয়ে, তবে হাত বাড়িয়েই আছেন আমাদের দিকে। সেই হাত ধরার লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়াতেই আমাদের উদ্বোধন, উত্তরণ।

 

তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা:

১) বিদ্যাসাগর রচনা সংগ্রহ- বিদ্যাসাগর স্মারক জাতীয় সমিতি।

২) চারিত্রপূজা : বিদ্যাসাগরচরিত- রবীন্দ্র রচনাবলী।

৩) বিদ্যাসাগর জীবনচরিত ও ভ্রমনিরাস- শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন।

৪) কর্মাটাঁড়ে বিদ্যাসাগর- ডাঃ প্রশান্ত কুমার মল্লিক।

৫) করুণাসাগর বিদ্যাসাগর- ইন্দ্রমিত্র।

বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন, দিল্লী

 

বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন, দিল্লী: "সাহিত্য পত্রিকা দিগঙ্গন উৎসব সংখ্যা" এবং পূর্ণাঙ্গ বই "লকডাউন নকডাউন, একটি সংকলন"

 








১৭ই অক্টোবর, ২০২০, শনিবার মুক্তধারা প্রেক্ষাগৃহে বিকেল ৫টায় একটি মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন, দিল্লীর পক্ষ থেকে বিশেষ বই "সাহিত্য পত্রিকা দিগঙ্গন উৎসব সংখ্যা" এবং পূর্ণাঙ্গ  বই "লকডাউন নকডাউন, একটি সংকলন" এর আবরণ উন্মোচন করা হল। বই দুটির আবরণ উন্মোচন করেন দিল্লীর বিশিষ্ট সাহিত্যিক মণিরত্ন মুখোপাধ্যায়,  ভারত সরকারের উচ্চপদস্থ আধিকারিক ও বাংলাসাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক শ্রী সুমন্ত ভৌমিক মহাশয় এবং সাংবাদিক ও সাহিত্যিক সমৃদ্ধ দত্ত।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশন করেন মৌসুমি আচার্য এবং শাশ্বতী গাঙ্গুলী।

এই অভিনব অনুষ্ঠানে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন অ্যাসোসিয়েশনের সহ সভাপতি তপন রায়, শ্রী উৎপল ঘোষ ও শ্রী সজল মিত্র।

এছাড়া উপস্থিত ছিলেন দিগঙ্গন সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক ব্রততী সেনগুপ্ত, বিশিষ্ট সাহিত্যিক শ্রী গৌতম দাসগুপ্ত এবং বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ডা: তপন মুখার্জী।

দীর্ঘ লকডাউন পরিস্থিতিতে বন্দী জীবনের প্রতিচ্ছবি ও তার প্রতিবিম্ব নিয়ে প্রকাশিত "লকডাউন, নকডাউন- একটি সংকলন" বইটির সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করেন শ্রীমতি জয়ন্তী অধিকারী ও শ্রীমতি পৃথা দাস।

এই কঠিন পরিস্থিতিতেও যাতে সাধারণ মানুষ শারদ উৎসবের দিনগুলিতে সাহিত্যের রসাস্বাদন করতে পারেন তার জন্য এই প্রয়াস। সেই লক্ষ্যে মুক্তধারার প্রেক্ষাগৃহে যথেষ্ট সংখ্যক সাহিত্যানুরাগী সমন্বয়ে এই অনুষ্ঠান সাফল্য অর্জন করেছে।

সমগ্ৰ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন শ্রী দেবাশীষ ব্যানার্জী।

সবশেষে সমগ্ৰ অনুষ্ঠানের সর্বাঙ্গীন সার্থকতার পরিপ্রেক্ষিতে সকলকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানান অ্যাসোসিয়েশনের  সাধারণ সম্পাদক শ্রী তপন সেনগুপ্ত।

প্রতিবেদন - তপন সেনগুপ্ত।

 

Bengal Club, Shivaji Park

 




Saturday, October 17, 2020

বিদ্যাসাগর: দেবাশীষ মিশ্র, জামতাড়া

 বিদ্যাসাগর

দেবাশীষ মিশ্র, জামতাড়া


এ বছর আমরা স্মৃতিরক্ষা সমিতি কোন আয়োজন করিনি, আমরা স্থানীয়, সমিতির সদস্যরা যাবো, মাল্যদান করব, ৬ জন ছাত্র- ছাত্রীদের পুরস্কার দিয়ে ফিরে আসবো এই কথা ছিল, পরে জামতাড়া জেলার DC সাহেব আসবেন কথা হোল, ঠিক ১০ টার সময়, সবাই উপস্থিত হলেন, যথারীতি অনুষ্ঠান হোল, খুব অল্প সময়ের মধ্যে। মিডিয়ার বন্ধুরা ছিল।

খবরের কাগজে খবর ছাপা হোল, কয়েকদিন পর বিকেলে আমি বিকালবেলায় বাড়ির থেকে একটু দূরে একটি পল্লীতে বেড়াতে গেলাম,  কি অবাক কান্ড!

একটি বটগাছ তলায় কয়েকজন বসে গল্প করছিল, তারা পরিচিত আমাকে দেখে খুশি হয়ে উঠলো, আমি তাদের গল্প গুজবে জমে উঠলাম।

একজন বলে উঠলো, আপনাদের গল্প আমরা করছিলাম। আমি জানতে চাইলাম কোন গল্প ?

ওরা বললে যে আপনারা বিদ্যাসাগরের অনুষ্ঠান করছিলেন, তার কথা, বিদ্যাসাগর একজন খুব বড় মানুষ ছিলেন, গরিবের বন্ধু ছিলেন, কত বড় পন্ডিত মানুষ। তিনি বিধবা বিবাহ আইন পাস করিয়ে কত দুঃখিনির দুঃখ দূর করেছিলেন, শুধু তাই নয়, নিজের একমাত্র ছেলের বিয়ে বিধবার সাথে দিয়েছিলেন, সমাজের কত উপকার করেছেন।

এখনকার লোকের মত নয় যে মুখে যা বলতেন তা করতেন না, উনি নিজের জন্য তাই করেছেন।

আমি ভীষণ অবাক হয়ে গেলাম, যারা বাংলা পড়েন না, যারা ভীষণ সাধারণ মানুষ, মূলত কৃষি  শ্রমিক, বাবু নয়, তারাও এই খবর রাখে !

আমি বাড়ি ফিরে শুধু ভাবতে শুরু করলাম ...

অনেকদিন ধরে আমরা অনুষ্ঠান করে আসছি, মানুষ এর মাঝে বিদ্যাসাগরকে পৌঁছে দিতে, কোন বাবু সমাজের মানুষ তো এই ভাবে চিন্তা করে না।

আমি ভাবতাম আমাদের এই প্রচেষ্টা কতদূর পৌঁছে গেছে, কিন্তু কোনদিন ভাবিনি যে এই সাধারণ মানুষ যারা বাঙালিও নয়, স্থানীয় বাংলা ভাষা ব্যবহার করে, কিন্তু কোনদিন বাংলা ভাষায় লেখাপড়া করেনি, সেই সাধারণ, গাছতলায় বসে বিদ্যাসাগর চর্চা করে, এ যেন পরম প্রাপ্তি !

এই সাধারণ সমাজের মাঝে আরো অনেক কাজ করার ইচ্ছে রাখতে হবে ....

 

Friday, October 16, 2020

দ্বিশত-জন্মবর্ষে বিদ্যাসাগর ও আমাদের মাতৃভাষা: মহীদাস ভট্টাচার্য্য শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী বুদ্ধিজীবী মঞ্চ, কলিকাতা

 দ্বিশত-জন্মবর্ষে বিদ্যাসাগর ও আমাদের মাতৃভাষা

 


মহীদাস ভট্টাচার্য্য

শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী বুদ্ধিজীবী মঞ্চ, কলিকাতা


বিশ্বের কোনো কোনো দেশে এমন কিছু মহাপ্রাণের আবির্ভাব ঘটেছে যাঁরা উত্তরকালের প্রজন্মকে বাধ্য করেন তাঁদেরকে অনুসরণ করতে। বাংলা-ভাষাভাষীর সৌভাগ্য তেমনি। ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এই রকম এক মহাপ্রাণ। মৃত্যুর ১৩০ বছর পরেও নবীন উৎসাহে বঙ্গভাষীরা তাঁর স্মৃতি সামনে রেখে নিজেদের চলার পথটি নির্ধারণ করতে উদ্যোগী হয় স্বত:স্ফূর্ত প্রাণের আবেগে। বহু প্রতিষ্ঠান বিদ্যাসাগরের দ্বিশতজন্মবার্ষিকী পালন করছে এই কারণেই।  নন্দন কানন উদ্‌যাপন কমিটি, কার্মাটাঁড়, অল ইণ্ডিয়া বেঙ্গলি এসোসিয়েশন, নিউদিল্লী, ঝাড়খণ্ড বাঙালি সমিতি ও বিহার বাঙালি সমিতি যৌথভাবে এইরকম একটি উদ্যোগ নিয়েছেন। সেই উদ্যোগে সামিল হয়ে বিদ্যাসাগর তর্পণের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য বাংলার শিল্পী-সাংস্কৃতিককর্মী-বুদ্ধিজীবী মঞ্চের সদস্য হিসেবে আন্তরিকভাবে গৌরব বোধ করছি, অনুপ্রাণিতও বটে।

 

ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বহুধাবিস্তৃত কর্মযোগে আপাতভাবে ভিন্নতা থাকলেও এগুলির মধ্যে একটি সমন্বয়ের যোগসূত্র রয়েছে। সেটি হলো তাঁর মানুষের প্রতি অসীম মমত্ব ও নতুন মানুষ গড়ার স্বপ্ন। সবার উপরে মানুষ সত্য এটি প্রতিষ্ঠা করার আত্মবিশ্বাস তাঁকে অস্থির রাখত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই। চঞ্চল থেকেছেন আমৃত্যু। সামন্তীসমাজের জাতিধর্ম নির্বেশেষে প্রান্তিক মানুষের জীবনযন্ত্রণার পেছনে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস ও সে বিষয়ে আমাদের অজ্ঞতা তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন কার্মাটরের আদি অধিবাসীদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে। প্রতিকারের সন্ধানও ছিল তাঁর কাছে। বিশেষ করে পাশ্চাত্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পরে। কিন্তু তখন তিনি জীবন সায়াহ্নে।

ইস্টইণ্ডিয়া কোম্পানীর হাতে দেশের শাসনভার চলে যাওয়ার পর শুরু হল একটা অস্থিরতার যুগ। ব্যক্তি-মানুষের অস্তিত্ব নতুনরূপে প্রকাশ পেতে চাইছিল।  সমাজ অভ্যন্তরে এই অস্থিরতার কালে বাংলার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে এসেছিলেন নতুন নাগরিক সভ্যতায়, যেখানে দুরাচার অনাচার, ব্যভিচার, নীতিহীনতার আধারেই গড়ে ওঠা বাবু-সংস্কৃতিতে ব্যক্তিকে আকণ্ঠ ডুবিয়ে রেখেছিল। অন্যদিকে সমাজমননে প্রাধান্য পেয়ে আছে অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার, ইসলামী ভাবনা ও ব্রাহ্মণ্যবাদের আধিপত্য, বর্ণবিদ্বেষের দ্বন্দ্ব ইত্যাদি । এই অবস্থায় ফরাসীবিপ্লবের উত্তর কালের কোলকাতার নতুন নগর সভ্যতায় তাঁর আগমন। পুরানো সবকিছুকে ভেঙ্গে নতুন কিছু একটা গড়ে উঠতে চাইছে সমাজ অভ্যন্তরে। তারই আকুতি অনুভব করেছিলেন গভীরভাবে কৈশোরে হিন্দুকলেজ ও স্কুল পরিবেষ্টিত সংস্কৃত কলেজের ছাত্রজীবনে। প্রাচ্যের পরিপূর্ণতার পাশে পাশ্চাত্যের ভাবনার একটা আঁচ পেয়েছিলেন। শিক্ষা অর্জনের উত্তরকালে সেগুলিই তাঁর জীবনের আদর্শের ভিত হিসেবে কাজ করেছিল। প্রাচীনত্বের বেড়াজাল থেকে পেরিয়ে তিনি আধুনিক মানুষ তৈরির কর্মযজ্ঞে ডুবে গিয়েছিলেন। 1841 থেকে তার যাত্রাশুরু যার পরিসমাপ্তি 1891-এ, জীবনের প্রায় শেষদিন পর্যন্ত। কার্মাটরের কর্মযোগ অন্তিম পর্বে।

কার্মাটরের জীবনের পেছনে নানাজন নানামত প্রকাশ করেছেন। প্রমথনাথ বিশী মনে করতেন “ঘরে বাইরে আঘাতে তিনি নাকি মানুষ সম্পর্কেই অনাস্থাবাদী বা সিনিক হয়ে ওঠেন; মানববিদ্বেষী মিস্‌আ্যানথ্রোপ বললেও ভুল হয় না।” সুমিত সরকারের মতো ঐতিহাসিকও মনে করেন –বিদ্যাসাগরের শেষজীবনে কার্মাটরেই কাটিয়েছেন, সাঁওতালরাই ছিলেন তাঁর একমাত্র সঙ্গী।“ (রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য্য, ২০১১)। আসলে ব্যাপারটা তা নয়। এ কথা ঠিক যে তিনি তাঁর জীবনের শেষকটা দিন সাঁওতালদের মধ্যে, এ দেশের আদি অধিবাসীদের কাছে এক নতুন প্রাণের সন্ধান পেয়েছিলেন । কিন্তু কলিকাতার মুখ্য কর্মযজ্ঞের বাইরে থেকে তা নয়।

বিরক্ত হয়েছিলেন পরিবারের সদস্য, বীরসিংহের প্রতিবেশি, কোলকাতার বন্ধু ও সহযোগীস্থানীয়দের একাংশ,  দেশবাসীর একাংশের উপরেও। কারণ তারা সঙ্কীর্ণ সামন্তীমনোভাবাশ্রিত কুশ্রীতা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য চেষ্টাই করেনি। যেমন আজকের এই বিশাল দেশে একটা বিরাট অংশের মানুষ ধর্মীয় নিরপেক্ষতার সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে মেতে উঠেছে ধ্বংসের কর্মযজ্ঞে। তেমনি সেদিন বঙ্গবাসীর একটা অংশ সঙ্কীর্ণতাকে আশ্রয় করে উপকৃত হয়েও প্রবঞ্চিত করেছিল তাঁকে, সমাজের প্রয়োজনে কর্তব্যকে উপেক্ষা করেছিল। সঙ্কীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থের উর্ধে উঠতে পারেনি। এতে তিনি যদি মানববিদ্বেষী হতেন তাহলে 1864-র মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশান, যেটি 1872-এ কলেজে রূপান্তরিত হয়, সেই প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক কর্মযজ্ঞে তাঁকে পাওয়া যেত কি? কার্মাটর ও কোলকাতা দুটোই নিত্য কর্মযোগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন তিনি। সফল হয়েছিলেন তাতে। বিদেশি শাসকের আধিপত্যের বাইরে এসেও শিক্ষা সংস্কারে তাঁর উদ্যোগের সঠিকতা প্রমাণ করতে। মেট্রোপলিটনকে গড়ে তুলেছিলেন শিক্ষিত দেশীয়দের নিয়ে। বিদেশীদের সাহায্য ব্যতিরেকেই সফল করে তুলেছিলেন সেই যুগে। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন বিদেশি রেজিস্ট্রার বলতে বাধ্য হয়েছিলেন The Pundit has done wonders। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় বলেছিলেন সত্যিকারের জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এই সময় তিনি কার্মাটরের জীবনের মধ্যেও ছিলেন। আরও নানা ঘটনা প্রমাণ করে তাঁর উভয়স্থলে কর্মযোগের ব্যাপ্তি। জীবনের শেষ মুহূর্তে নারায়ণ তাঁর কাছে ‘কী কষ্ট হচ্ছে’ জানতে চাইলে তিনি উত্তর দেন “দু:খ হচ্ছে মেট্রোপলিটন স্কুল ও কলেজের শিক্ষকদের জন্য, চাকুরীজীবন অন্তে গ্রাসাচ্ছাদনের কোনও ব্যবস্থা করে যেতে পারলাম না।“ (ইন্দ্রমিত্র, ২০১৬, ৫৮২)

কার্মাটরের মানুষের সঙ্গে তাঁর পরিচিতি দেশের প্রান্তিক জীবনের সঙ্গে পরিচয় ঘটিয়ে দিয়েছিল।  সেটি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ মনুষ্যত্ব ও  মমত্বের অসীমতার অনুরণন মাত্র। চঞ্চল করেছিল। বুঝেছিলেন ভারতীয় আর্য-আধিপত্যবাদী ও ইসলামী সামন্তীশাসক অধ্যুষিত সমাজ দেশেরই একদল মানুষকে অতি প্রান্তিকবাসী করে দিয়েছে। কার্মাটরে তাদেরই বাস। নতুন সভ্যতার বিকৃতি নগর ছেড়ে এই প্রান্তিক মানুষকে স্পর্শ করতে পারেনি। তাই তাদের সঙ্গে কাল কাটাতে চেয়েছিলেন তিনি। এটি তাঁর কর্মযোগে একটি নতুন সংযোগ। নগর কোলকাতায় সেদিন আজকের দলীয়-গণতন্ত্র গড়ে উঠেনি। ব্যক্তি বিদ্যাসাগর তাঁর কর্মযোগের ক্ষেত্র হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন কার্মাটরকে। গড়ে তুলেছিলেন প্রান্তিক মানুষের মনন ও জীবনের সঙ্গে অতিপরিচিত  মানবপ্রীতির আদানপ্রদান। পরিপূর্ণতা পেয়েছে তাঁর কর্মযোগ। এখানকার সাঁওতাল ও প্রান্তিক অধিবাসীদের মধ্যেও তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন নতুন মানুষ তৈরির। গড়ে তুলেছিলেন স্কুল, মেয়েদের জন্যও। সান্ধ্য স্কুল। সেবায় ছিলেন কার্পণ্যহীন, সহায়তায় আজকের পুণ্যলোভাতুরদের মতো নয় মানবদরদী মন নিয়ে সময় অতিবাহিত করেছেন আনন্দের সঙ্গে । আদি অধিবাসীদের সহজ-সরল অকপট মননরীতি ও জীবনধারায় প্রাণের স্পর্শ পেয়েছিলেন, আকৃষ্ট করেছিল তাঁকে। এ দিয়েই তিনি মুখ্যধারার তথাকথিত আভিজাত্য ভেঙে প্রান্তিক ও উপেক্ষিত মানুষের সঙ্গে মানবতাবাদের ভিতের উপর প্রীতির সেতু রচনা পথ দেখিয়ে গিয়েছিলেন,  যা আজও অনেকের উপলব্ধিতে আসে না।

সামগ্রিকভাবে বীরসিংহের গ্রামবাংলার জীবনে, কোলকাতা নগরীর বিদেশি আধিপত্য,  রক্ষণশীল ও চতুর নাগরিক সমাজে  এবং কার্মাটরের প্রান্তিক মানুষের মধ্যে  নতুন যুগের মানুষ তৈরির আমৃত্যু কর্মযোগী ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যথার্থই আধুনিক ভারতীয় সমাজে ‘সবার উপরে মানুষই সত্যে’র উপাসক ও বিজ্ঞানমনস্ক মানবতাবাদী ভাবনার পথিকৃৎ হিসেবে আমাদের সামনে আজও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। কিন্তু তাঁর শুরুকরা কর্মযোগের অসম্পূর্ণতা আজও এই স্বাধীন দেশে নতুন নতুন প্রান্তিকমানুষের জন্ম দিচ্ছে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আবর্তে অতীতের প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও এই অগণিত অর্থনৈতিক ও উপেক্ষিত সঙ্কট জর্জরিত প্রান্তিক মানুষ। যেন তিনিই মানবদরদী নতুন মানুষ তৈরির আহ্বান জানাচ্ছেন, সক্রিয়ভাবে সাড়া দেওয়াই হবে স্মরণের তাৎপর্য।

শিক্ষাসংস্কারে বাংলাভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলে তিনি মাতৃভাষার বিপন্নতা রক্ষা ও তার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করে ভাষা-উন্নয়নের একটি দৃষ্টিভঙ্গী আমাদের সামনে রেখে গিয়েছেন। আজকের প্রেক্ষাপটে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁকে স্মরণ করে সেই বিষয়ে দু-একটি বিষয় আপনাদের সামনে উপস্থিত করব।

 

উৎস:

ভট্টাচার্য্য রামকৃষ্ণ। বিদ্যাসাগর নানা প্রসঙ্গ। চিরায়ত প্রকাশন। ২০১১।

ইন্দ্রমিত্র। করুণাসাগর বিদ্যাসাগর। আনন্দ। ২০১৬।

15-09-20

দুমকার জেলা প্রশাসন বাংলা ভাষার পরিসংখ্যান লোপাট করেছে

 দুমকার জেলা প্রশাসন বাংলা ভাষার পরিসংখ্যান লোপাট করেছে

 

দুমকা : বিধানসভা উপ নির্বাচনে দুমকা জেলার ভাষা পরিসংখ্যান নিয়ে জেলা প্রশাসনের ভাষার রাজনীতি নিয়ে রাজ্যের একটি ভাষা সংগঠন সোচ্চার হয়েছে। জেলার জাতীয় তথ্য প্রযুক্তি কেন্দ্র নিজের প্রোফাইলে দুমকার ভাষা হিন্দি ও সাঁতালি দেখান হয়েছে। জেলার সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগন বাঙালি ও বাংলা ভাষী। জামা, জারমুন্ডি, রামগড়, সরয়াহাট ব্লকের গ্রামাঞ্চলে খোরটা প্রধান ভাষা। রাজ্য মন্ত্রী মণ্ডলের ২০১১ র বৈঠকে বাংলা, সাঁতালি ও খোরটা ভাষা’কে দ্বিতীয় সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। নভেম্বর ২০১১ ঝাড়খন্ড গেজেটে ঐ নোটিফিকেশন টি প্রকাশ করা হয়েছে। এন আই সির রিপোর্টে দুমকা জেলার সূচনা প্রকাশ করে বাংলা ও খোরটা ভাষার উল্লেখ না করে ওই জাতি গোষ্ঠীর অপমান করা হয়েছে । ১৯৩২ সালের অন্তিম সার্ভে রেকর্ডে জেলার বিভিন্ন মৌজার নকশা ও পর্চা বাংলা ভাষায়। এখনো রেজিস্ট্রি অফিসে বাংলা ভাষায় দলিল লেখা চালু আছে। জেলা প্রশাসন উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে বাংলা ভাষার পরিসংখ্যান লোপাট করেছে। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা সমিতির স্টেট সেক্রেটারি গৌতম চট্টোপাধ্যায় উপ নির্বাচনের দিন ধার্য হওয়ার অনেক আগে মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সরেনের কাছে এন আই সির রিপোর্টে বাংলা ভাষা’কে অন্তর্ভুক্ত করার দাবী করেছে। তবে মুখ্যমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর দলের হেভিওয়েট বাঙালি নেতারা মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন।

ঝাড়খন্ড বঙ্গভাষী জাগরণ: শারদ অর্ঘের ১৯ তম সংখ্যার উন্মোচন

 ঝাড়খন্ড বঙ্গভাষী জাগরণ: শারদ অর্ঘের ১৯ তম সংখ্যার উন্মোচন

 


 


দুমকা, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা সমিতি, ঝাড়খণ্ডের পক্ষ থেকে মহা সপ্তমীর দিন শুক্রবার ৬ কার্তিক ইং ২৩ অক্টোবর ২০২০ ঝাড়খন্ড বঙ্গ ভাষী জাগরণের শারদ অর্ঘের ১৯ তম সংখ্যার উন্মোচন করা হবে। ভারত সেবাশ্রম সংঘের দুমকা শাখার স্বামী প্রণবা নন্দ বিদ্যামন্দির আবাসিক বিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিক রূপে পত্রিকার উম্মোচন করা হবে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন জ্ঞান বিজ্ঞান সমিতির জাতীয় সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ড. কাশী নাথ চ্যাটার্জি, বিশিষ্ঠ লেখক অজিত রায়, আশ্রমের স্বামী নিত্যব্রতা নন্দ মহারাজ ও সমিতির স্টেট সেক্রেটারি গৌতম চট্টোপাধ্যায়। পত্রিকার মুদ্রণ এর কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। করোনা সংক্রমণের ভয়াবহতার মধ্যে মোহাম্মদ বাজারের মন্ডল প্রেসে চলছে বাইন্ডিং এর কাজ। পত্রিকার  কাভার পেজে ঝাড়খন্ড বঙ্গ ভাষী জাগরণ পত্রিকার ১৮ তম সংখ্যার উন্মোচন ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ এর অনুষ্ঠানে ফটো ছাপা হয়েছে। ২১ ফেব্রুয়ারি র অনুষ্ঠানে বিহার বাঙালি সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুনির্মল দাস, নিখিল ভারত বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ এর বিপুল গুপ্ত, পশ্চিম বর্ধমান জেলার আসনসোলের ভাষা সৈনিক ভুদেব মুখোপাধ্যায় ও সাহেবগঞ্জের কর্মকর্তা হিমাংশু শেখর গুহ’কে সম্মানিত করা হয়। পত্রিকায় ওই ফটো গুলি প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন - গৌতম চট্টোপাধ্যায়, দুমকা

Tuesday, October 13, 2020

পুজোর বার্তা: অজয় কুমার দত্ত, জামালপুর

 পুজোর বার্তা

--------------!-!------

অজয় কুমার দত্ত, জামালপুর

আকাশ জুড়ে ওই যে সাদা

ভাসছে মেঘের ভেলা,

মাঠে-ঘাটে ঢেউ খেলে যায়

 কাশফুল এরই মেলা!


' আয়রে ছুটে আয় পুজোর গন্ধ এসেছে"

অন্তরার এই গানেতে হৃদয় নেচেছে!

পরছে মনে কত কথা

কত নতুন গান,

শিশির ভেজা সবুজ ঘাসে

জাগছে নতুন প্রাণ!

কিন্তু এবার পুজো অন্যরকম

 নেইকো খুশির বন্যা,

কানটি পেতে যাচ্ছে শোনা

 সব হারাদের কান্না!


 তা ধিন ধিন ঢাকের তালে

 নাচবে না আর কেউ,

খুশির পালে লাগল এবার

 নীরব ব্যথার ঢেউ!


 তবু সবাই ভালো থেকো

 রইলো আমার প্রীতি,

 জীবনেতে হার মেনো না

থাকুক হাজার ভীতি!



দ্বিশতজন্মবর্ষ পূর্তিতে শিক্ষাগুরু বিদ্যাসাগর স্মরণে: অম্বিকেশ মহাপাত্র

 দ্বিশতজন্মবর্ষ পূর্তিতে শিক্ষাগুরু বিদ্যাসাগর স্মরণে

অম্বিকেশ মহাপাত্র

 


সারাবিশ্বের মানুষ প্রায় ৬৫০০টি ভাষায় নিজের ভাব প্রকাশ করেন অর্থাৎ কথা বলেন। তারমধ্যে ‘বাংলা’ ভাষায় ভাব প্রকাশ করেন প্রায় ২৬.১ কোটি বিশ্ববাসী। চীনা ভাষায় কথা বলা মানুষের সংখ্যা সবচাইতে বেশী, সেখানে ‘বাংলা’ ভাষার স্থান অষ্টম! আমাদের প্রিয় দেশ বহু ভাষাবাসীর দেশ, বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান, সেটাই আমাদের গর্ব। সকল ভারতবাসী প্রায় ১২১টি ভাষায় তাঁদের মনের ভাব প্রকাশ করেন। হিন্দি ভাষায় কথা বলা মানুষের সংখ্যা সর্বাধিক, সেখানে ‘বাংলা’ ভাষার স্থান দ্বিতীয়! প্রায় ৯.১ কোটি ভারতবাসী ‘বাংলা’ ভাষাতে কথা বলেন। আমাদের দেশের কাঠামো যুক্তরাষ্ট্রীয়। দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কেন্দ্র এবং রাজ্যস্তরে মোট ২২টি ভাষা সরকারি কাজে ব্যবহৃত হয়। ‘বাংলা’ ভাষা তাদের মধ্যে অন্যতম। ‘বাংলা’ ভাষা আমাদের পড়শী দেশের জাতীয় ভাষা। দেশবাসীর মায়ের ভাষার নামেই পড়শী দেশের নাম, বাংলাদেশ। দেশ ভাগ সহ ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির আগে অধুনা বাংলাদেশ (পূর্বনাম পূর্ববঙ্গ) পশ্চিমবঙ্গ সহ বঙ্গদেশ আমাদের দেশ ভারতবর্ষের অঙ্গই ছিল। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ জন ছাত্র (সালাম, বরকত, রফিক, জব্বর এবং সফিকুর) নিজ মায়ের ভাষা, ‘বাংলা’ ভাষার মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্রশক্তির গুলিতে শহীদের মৃত্যুবরণ করেছেন। সেকারণে মাতৃভাষা স্মরণে ২১শে ফেব্রুয়ারী বাংলাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দিবস, ‘ভাষা শহীদ দিবস’ হিসেবে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে। পরবর্তী সময়ে UNESCO সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় ২০০০ সাল থেকে ২১শে ফেব্রুয়ারী সারা বিশ্বে প্রতিটি মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

আমার মায়ের ভাষা ‘বাংলা’। সকল মানুষের সুখ-দুঃখের আধার বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবি ঠাকুরের ভাবনা ও উপলব্ধিতে ‘মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধসম’। অর্থাৎ মায়ের ভাষা মায়ের দুধের সমান। প্রাথমিকস্তরে শিশুর জীবনধারণের একমাত্র খাদ্য মায়ের দুধ, শিশুর একমাত্র প্রতিষেধক মায়ের দুধ। শিশু মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর সুতীব্র চিৎকারে তার নিরাপত্তার দাবী জানায়। গর্ভধারিণী মা শিশুকে কোলে নিয়ে দুগ্ধপানের মাধ্যমে একাত্মতা সহ নিরাপত্তা দেন। শিশু মায়ের কোলে নিরাপদ আশ্রয়ে দুগ্ধপানে আনন্দানুভূতি খুঁজে পায়। পরবর্তী সময়ে শিশু মায়ের নিরাপত্তা বেষ্টনীতে থেকে মায়ের এগিয়ে দেওয়া ‘বর্ণপরিচয়’ মাধ্যমে মায়ের ভাষার বর্ণ/ অক্ষর চেনা শুরু করে এবং পাশাপাশি শিক্ষাঙ্গনে প্রবেশের ছাড়পত্র অর্জন করে। বাংলা ভাষার সেই ‘বর্ণপরিচয়’ প্রণয়ন করেছেন পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০২০ পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দ্বিশতজন্মবর্ষ পূরণ হল। ঈশ্বরচন্দ্র ঊনবিংশ শতকে অমানবিক এবং তীব্র কুসংস্কারাচ্ছন সময়কালে কুসংস্কারমুক্ত মানবিক সমাজের জন্য আন্দোলন গড়ে তুলে ছিলেন। বিশেষ করে ঈশ্বরচন্দ্র মায়েদের অসহায় অবস্থার স্থায়ী সমাধানে মেয়েদের জন্য শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলন, বহু বিবাহ রদ এবং বিধবা বিবাহ চালু করতে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন এবং আন্দোলন গড়ে তোলেন।

পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র আমার প্রথম শিক্ষাগুরু। শুধু আমারই কেন? আমাদের জাতীর শিক্ষাগুরু। জাতির শিক্ষাগুরু বিদ্যাসাগরকে স্মরণে রাখার উদ্যাগে বিদ্যাসাগরের নামে একাধিক বিদ্যালয়, একাধিক মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, উদ্যান, রাস্তা, প্রেক্ষাগৃহ, সেতু, মূর্তি, সমবায় ব্যাঙ্ক, প্রতিষ্ঠান, পুরস্কার প্রচলিত রয়েছে। বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ আমাদের অক্ষর জ্ঞান সহ ‘বাংলা’ ভাষা শিক্ষার প্রথম সোপান। যা পরবর্তী সময়ে নতুন নতুন জ্ঞান অন্বেষণে আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। এই প্রেক্ষিতে অত্যাধুনিক ই-বিশ্বে দ্বিশতজন্মবর্ষ পূর্তিতে বিদ্যাসাগরকে নতুনভাবে স্মরণের তোড়জোড়। তারই প্রাক্কালে আমাদের বাংলার রাজধানী তথা দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী কলকাতা মহানগরে ঈশ্বরচন্দ্র প্রতিষ্ঠিত বিদ্যাসাগর কলেজ প্রাঙ্গনে বিদ্যাসাগরের মূর্তি দুষ্কৃতকারীদের সংগঠিত উদ্যোগে রাস্তায় আছাড় মেরে ভেঙ্গে ফেলে উল্লাস! তারসঙ্গে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চাপান উতোর! বাঙালির হৃদয় আজ রক্তাক্ত ক্ষত-বিক্ষত। জল্লাদ বাহিনী তা জানে না, মূর্তি ভেঙ্গে উল্লাস করে বিদ্যাসাগরের চিন্তা, ভাবনা, সৃষ্টকর্মকে মুছে ফেলা যায় না! আমাদের মায়ের ভাষার বর্ণ পরিচয়ের পথিকৃৎ ধূলায় গড়াগড়ি যাচ্ছে দেখে শুধু কষ্ট পাওয়া নয়, শুধু ধিক্কার নয়, শুধু আক্ষেপ নয়, আসুন আমরা সকলে মিলে বিদ্যাসাগরকে অধিকতর মর্যাদার সঙ্গে স্মরণ করি। তার মধ্যদিয়ে শুধু বিদ্যাসাগরকে নয়, ‘বাংলা’ ভাষা তথা মায়ের ভাষা তথা আমাদের মাকে শ্রদ্ধা জানাতে পারবো।   

১৮২০ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর অধুনা পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে দরিদ্র কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবারে ঈশ্বরচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মাতা ভগবতী দেবী। ৯ বছর বয়সে গ্রামের শিক্ষা সাঙ্গ করে উচ্চ শিক্ষালাভের জন্যে বাবার সঙ্গে কলকাতায় চলে আসেন। বাবা অল্প মাহিনের চাকুরীর কাজে কলকাতায় অপরের বাড়িতে থাকতেন। ঈশ্বরচন্দ্র বাবার সঙ্গে থেকে সংস্কৃত কলেজে পড়াশোনা শুরু করেন। ঈশ্বরচন্দ্র অপরের বাড়ির গৃহস্থালির কাজকর্ম এবং ফাইফরমাস খেটেও লেখাপড়া চালিয়ে যান। আলোর অভাবে ঈশ্বরচন্দ্রকে রাস্তার আলোয় পড়াশোনা করতে হয়েছে। এই রকমের দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে পড়াশোনায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন এবং অনেকগুলি শিক্ষাবৃত্তি অর্জন করেন। সংস্কৃত, ব্যাকরণ, সাহিত্য, অলঙ্কার শাস্ত্র, বেদান্ত, স্মৃতি প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞানার্জন করেন। সেকারণে শিক্ষিত মহল ঈশ্বরচন্দ্রকে একাধারে ‘পন্ডিত’ অপরপক্ষে বিদ্যার সাগর অর্থাৎ ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিতে ভূষিত করেন। সেই থেকে ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ‘পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর’ হিসেবে জনমনে পরিচিত হয়ে আছেন।

ঈশ্বরচন্দ্র পেশাগত কর্মজীবনে শিক্ষক এবং শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্বে থেকে শিক্ষা প্রসারে এবং সমাজ সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। মাতৃভক্ত ঈশ্বরচন্দ্র মায়ের ইচ্ছে পূরণে এবং মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনস্বরূপ নারী-শিক্ষা প্রসারে প্রথম মেয়েদের জন্য স্কুল স্থাপন করেন; বীরসিংহ গ্রামে, কলকাতা এবং পার্শ্ববর্তী জেলাগুলিতে। ঈশ্বরচন্দ্র চেয়েছিলেন ছেলেদের সঙ্গে মেয়েরাও লেখাপড়া করুক। মেয়েদের শিক্ষার আলোকে না এনে, অন্দরমহলে আটকে রাখলে, সমাজের কল্যাণ হতে পারে না। সেকারণে অমানবিক ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন- ‘কুলীন অর্থাৎ বহু বিবাহ তথা বাল্য বিবাহ প্রথা’র বিরুদ্ধে সরব ছিলেন। সমাজে অমানবিক অবজ্ঞার শিকার বাল্য বিধবাদের পুনর্বিবাহের জন্য, রক্ষণশীল হিন্দু সমাজপতিদের তীব্র বিরোধীতা সত্ত্বেও, লর্ড ডালহৌসির নেতৃত্বে ব্রিটিশ শাসকদের দিয়ে ‘১৮৫৬ সালে হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন’ প্রণয়ন করিয়েছিলেন। এবং নিজের একমাত্র সন্তান নারায়ন চন্দ্রের সঙ্গে বিধবার বিয়ে দিয়েছিলেন। রক্ষণশীল সমাজপতিদের প্রতি পদক্ষেপে তীব্র বাধাদান সত্ত্বেও স্পর্ধিত, ব্যতিক্রমী, অনন্য বিদ্যাসাগর কুসংস্কারমুক্ত সমাজ গঠনে আজীবন প্রয়াসী ছিলেন। সেই সময়কালে সমাজ সংস্কারের কাজ সহজ ছিল না। একদিকে পরাধীনতার শৃঙ্খল, অপরদিকে রক্ষণশীল সমাজপতিদের দাপট। তৎকালীন সমাজে খ্যাতকীর্তি প্রতিভারও অতুলনীয় সমাবেশ ঘটেছিল। রাজা রামমোহন রায়, ডেভিড হেয়ার, হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও, প্রভৃতি সমাজ সংস্কারক বাংলায় নবজাগরণ যুগের সূচনা করেছিলেন এবং এগিয়ে নিয়ে গেছিলেন। সেই বাংলায় নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের বিশ্লেষণে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। একাধারে দয়ারসাগর এবং অপরদিকে করুণাসাগর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ শাসকরা শুধু নয়, রক্ষণশীল সমাজপতিরাও সমীহ করে চলতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু স্বাধীন ভারতে জাতীর শিক্ষাগুরুর দ্বিশততম জন্মবর্ষ পালনের প্রাক্কালে বাংলায় শুধু শিক্ষাগুরুর মূর্তি আক্রান্ত হচ্ছে তাই নয়, শিক্ষার অঙ্গন সহ সমগ্র শিক্ষক সমাজকে নানানভাবে আক্রান্ত হতে হচ্ছে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উপর রাষ্ট্রের পুলিশ রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে আলো নিভিয়ে বর্বরোচিত কায়দায় আক্রমণ করছে, শিক্ষকদের বিনা অপরাধে গ্রেফতার করে হাজতে নিক্ষেপ করছে। তাই শিক্ষাগুরুর দ্বিশতজন্মবর্ষ পূর্তিতে নানান কর্মসূচি পালনের সঙ্গে শিক্ষক এবং শিক্ষার মর্যাদা ফিরিয়ে আনার শপথগ্রহণ করতে হবে। তার মধ্যদিয়ে জাতীর শিক্ষাগুরু পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর স্মরণ সার্থক হবে এবং শিক্ষাগুরুর ঋণ শোধ সম্ভব হবে।   

প্রসঙ্গক্রমে বিদ্যাসাগর সম্পর্কিত দুটি তথ্য উল্লেখের মাধ্যমে আমার শ্রদ্ধাজ্ঞাপন।

এক যে ছিল বিদ্যাসাগর

পূর্ণেন্দু পত্রী

 

এক যে ছিল বিদ্যাসাগর

ভীষণ বাজে লোক

বলতো কিনা বিধবাদের

আবার বিয়ে হোক?

 

এক যে ছিল বিদ্যাসাগর

দেখতে এলেবেলে

চাইতো কিনা লেখাপড়া

শিখুক মেয়ে, ছেলে?

 

এক যে ছিল বিদ্যাসাগর

দেমাকধারী ধাত্

সাহেব যদি জুতো দেখায়

বদলা তৎক্ষণাৎ।

 

এক যে ছিল বিদ্যাসাগর

বুদ্ধিসুদ্ধি কই?

লিখেই চলে লিখেই চলে

শিশুপাঠ্য বই!

 

এক যে ছিল বিদ্যাসাগর

কপালে তার গেরো

ওষুধ দিয়ে বাঁচায় কিনা

গরীব-গুর্বোদেরও!

 

এক যে ছিল বিদ্যাসাগর

মগজটা কি ফাঁকা?

যে যেখানে বিপন্ন তাঁর

জোগানো চাই টাকা?

 

 

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘চারিত্র পূজা’ শীর্ষক প্রবন্ধ সংকলনে এই মনীষী সম্পর্কে লিখেছেন- ‘বিদ্যাসাগর এই বঙ্গদেশে একক ছিলেন। এখানে যেন তাঁহার স্বজাতি সোদর কেহ ছিল না। এ দেশে তিনি তাঁহার সমযোগ্য সহযোগীর অভাবে আমৃত্যুকাল নির্বাসন ভোগ করিয়া গিয়াছেন। তিনি সুখী ছিলেন না। তিনি নিজের মধ্যে যে এক অকৃত্রিম মনুষ্যত্ব সর্বদাই অনুভব করিতেন, চারিদিকের জনমন্ডলীর মধ্যে তাহার আসন দেখিতে পান নাই। তিনি উপকার করিয়া কৃতঘ্নতা পাইয়াছেন, কার্যকালে সহায়তা প্রাপ্ত হন নাই। তিনি প্রতিদিন দেখিয়াছেন আমরা আরম্ভ করি, শেষ করি না, আড়ম্বর করি, কাজ করি না, যাহা অনুষ্ঠান করি তাহা বিশ্বাস করি না, যাহা বিশ্বাস করি তাহা পালন করি না, ভুরি পরিমাণ বাক্য রচনা করিতে পারি, তিল পরিমাণ আত্মত্যাগ করিতে পারি না, আমরা অহংকার দেখাইয়া পরিতৃপ্ত থাকি, যোগ্যতা লাভের চেষ্টা করি না, আমরা সকল কাজেই পরের প্রত্যাশা করি, অথচ পরের ত্রুটি লইয়া আকাশ বিদীর্ণ করিতে থাকি, পরের অনুকরণ আমাদের গর্ব, পরের অনুগ্রহ আমাদের সম্মান, অপরের চক্ষে ধূলি নিক্ষেপ আমাদের পলিটিক্স ...... এই দুর্বল, ক্ষুদ্র, হৃদয়হীন, কর্মহীন, দাম্ভিক, তার্কিক জাতির প্রতি বিদ্যাসাগরের এক সুগভীর ধিক্কার ছিল।’

*****************

 

 বিহার বাঙালি সমিতি পূর্ণিয়া শাখার নবনির্বাচিত কমিটির প্রথম বৈঠক সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আজকের এই গুরত্বপূর্ণ সভায় উপস্থিত সকল সদস্যদের আন...