Wednesday, July 15, 2020

অল ইন্ডিয়া বেঙ্গলী এসোসিয়েশন (আইবা)

ভারতের সমস্ত বাংলাভাষী সংগঠনকে

অল ইন্ডিয়া বেঙ্গলী এসোসিয়েশন (আইবা)

All India Bengalee Association (AIBA)

(Registration No. District East/Society/1806/15.06.2017)

সদস্য হতে আহ্বান জানাই। যোগাযোগ -

 

তপন সেনগুপ্ত, সর্বভারতীয় অধ্যক্ষ

allindiabengaleeassociation@gmail.com, ৯৮১০০৬১২৫১

 


সীমান্তের পাতা


আমাদের কফিহাউস


নামকরণ নিয়ে বিভ্রান্তি, ইতিহাসকে পাল্টানোর চক্রান্ত

নামকরণ নিয়ে বিভ্রান্তি, ইতিহাসকে পাল্টানোর চক্রান্ত

                                                প্রতিবেদক - গৌতম চট্টোপাধ্যায়, দুমকা (ঝাড়খন্ড)

 

        দুমকা জেলার শিকারীপাড়া ব্লকের সাঁতাল জাতি অধ্যুষিত গ্রাম কোলই বাড়ি। কোলই সাঁতালি শব্দের অর্থ খরগোশ। এই নাম থেকে জানা যায় গ্রামটি উপজাতি অধ্যুষিত। এখানে হিন্দি ভাষীরা কোলই বাড়ি কে কেলাই বাড়ি বানিয়ে ছেড়েছে। দেওঘর জেলার পালাজুড়ি ব্লক হেড কোয়ার্টার। রাঁচি থেকে প্রকাশিত দৈনিক বাংলা সংবাদ পত্রে লেখা হচ্ছে পলোজোরি, এই শব্দের কোন শাব্দিক অর্থ খুঁজে পায়নি ।তবে এটা খুব স্পষ্ট যে বাঙালি অধ্যুষিত পালাজুড়ির নামকে বিকৃত করা হয়েছে। কোলকাতা থেকে প্রকাশিত একটি বহুল প্রচারিত বাংলা সংবাদ পত্রে পাটনা কে পটনা লেখা হয়। ওই পেপারের সম্পাদকের কাছে পাটনা কে পটনা লেখার কারণ জানতে চাইলে বলেছেন সেখান কার লোকে পটনা বলে, তাই পটনা লেখা হয়। তবে কোলকাতার অন্য বাংলা সংবাদ পত্র গুলিতে পাটনা লেখা হয়। বাল্য বিধবা বিবাহের প্রবর্তক মহান সমাজ সংস্কারক পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কর্মভূমি জামতাড়া জেলার কারমাটাড় এর বিদ্যাসাগর নামকরণ করা হয়েছে। রেল স্টেশন এর নাম বিদ্যাসাগর স্টেশন, সেখান কার খোট্টা ভাষী সাধারণ মানুষ বিদিয়া সাগর স্টেশন বলে। গ্রেটার মানভূমের ধানবাদ কে হিন্দি ভাষীরা ধনবাদ বানিয়ে ছেড়েছে। তাহলে কি ভবিষ্যতে ওই বাংলা সংবাদ পত্র বিদ্যাসাগর কে বিদিয়া সাগর, ধানবাদ কে ধনবাদ  লিখে এখান কার বাঙালি অধ্যুষিত এলাকার ইতিহাস কে পাল্টে দেবে? ভাষা সৈনিকদের বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করা উচিত। 

Tuesday, July 14, 2020

চিঠি - পত্র

চিঠি - পত্র

মাননীয় সুনির্মলবাবু

সম্পাদক, সঞ্চিতা

         আপনার অবগতির জন্যে জানাই যে আমাদের মেদিনীপুর সমন্বয় সংস্থার কয়েকটি হোয়াটস্যাপ গ্রুপ আছে তাতে আপনার পোষ্ট করা আর্কিওলজিক্যালসার্ভে অফ ইন্ডিয়ার পেপার ও নন্দনকাননে কিছু ছবি পোষ্ট করেছিলাম এবং লিখেছিলাম গতবছর সমন্বয় সংস্থা মেদিনীপুর আঞ্চলিক ইউনিটএর পক্ষ থেকে কার্মাটারে গিয়ে ১২ আশ্বিন বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ২০০ তম জন্মদিন পালন করেছিলাম l সঙ্গে মানিক ঘাটাবাবু ও বিশ্বজিৎ সাউও গিয়েছিলেন l

  নন্দনকাননে বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুলটি চালু করার জন্যে পশ্চিম বঙ্গ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ভালো হয় l ডেপুটেশনে টিচার পাঠিয়ে অথবা শিক্ষকদের বেতন যদি পশ্চিম বঙ্গ সরকার প্রদান করতে পারে তাহলে সম্ভব হতে পারে l

  এবিষয়ে আপনাদের মতামত চাইছি l

 অমিত কুমার সাহু

০৪.০৭.২০২০


মেদিনীপুর ভবন: কলকাতা

মেদিনীপুর ভবন: কলকাতা

        মেদিনীপুর ভবন ঐতিহাসিক মেদিনীপুরের গর্ব। স্বাধীনতার ৭১ বছর পরে বহুমানুষের দানে ১ কোটি ৭০ লক্ষ টাকাতে কলকাতায় গড়ে তোলা হয়েছে বিদ্যাসাগরের নামে মেদিনীপুর ভবন। এখনো ৫০ লক্ষ টাকা লোন আছে l

        আমাদের এই ভবনের খবর সঞ্চিতা পত্রিকাতে ছাপতে অনুরোধ জানাই l

নমস্কারান্তে

অমিত কুমার সাহু

মেদিনীপুর।


Monday, July 13, 2020

শহীদ ক্ষুদিরাম বোসের মূর্তি

শহীদ ক্ষুদিরাম বোসের মূর্তি

গৌতম চ্যাটার্জী

     

নগর উন্নয়ন ও আবাস, বিভাগের এডিশনাল সেক্রেটারি চন্দন কুমার সারায়কেলা - খরশুয়া জেলার ডেপুটি কমিশনার কে চিঠি দিয়ে, ওই জেলার চান্ডিল সাভডিভিসন এর কান্ডরা চকের মহান যোদ্ধা শহীদ ক্ষুদিরাম বোসের আবক্ষ মূর্তি উপড়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টির তদন্ত করে যথাযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করার অনুরোধ করেছেন। মন্ত্রিমণ্ডল সচিবালয় ও অনুসন্ধান বিভাগের ১২ মার্চের আদেশ ও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা সমিতি, ঝাড়খণ্ডের স্টেট সেক্রেটারি গৌতম চট্টোপাধ্যায় এর মুখ্যমন্ত্রী’কে দেওয়া পত্রের কপি পাঠিয়ে, ওই পত্রে লাগান অভিযোগের তদন্ত করে যথাযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। এডিশনাল সেক্রেটারি ডেপুটি কমিশনার’কে পাঠান চিঠির কপি গৌতম বাবু’কেও পাঠিয়েছেন। স্টেট সেক্রেটারি চন্ডিলের তৎকালীন এস. ডি. ও. ড. বিনয় কুমার মিশ্রর নামে মহান যোদ্ধা শহীদ ক্ষুদিরাম বোসের তিরোধান দিবসের দিন ১১ আগস্ট ১৯ আবক্ষ মূর্তি উপড়ে নেওয়ার অভিযোগ জানিয়েছেন। সমিতির পক্ষ থেকে আবক্ষ মুর্তি পুন: প্রতিষ্ঠা করার সাথে দোষী আধিকারিক এর উপর দৃষ্টান্ত মূলক ব্যবস্থা করার অনুরোধ করা হয়। সমিতির পক্ষ থেকে মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যপাল ও প্রধানমন্ত্রী কে এই মর্মে পত্র দেওয়া হয়। রাজ্যে বিধানসভার নির্বাচন কে মাথায় রেখে বিজেপি জোট রাজ্য সরকার বিষয় টি চেপে যায়। রাজ্য মন্ত্রীমণ্ডল বিভাগের আদেশে নগর উন্নয়ন দপ্তরের এডিশনাল সেক্রেটারি এই আদেশ আসার পর রাজ্যের সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগনণর মূর্তিটি পুন: প্রতিষ্ঠা করার আসার সঞ্চার হয়েছে।


কাজরী গুহ - একটি কবিতা

মনের মন্তব্য !

 

জ‍য় বিজয়ের খেলায় যখন

মেতেছে আজ সবাই 

কলসি কাঁখেও চলছে বাঁকে

জীবনেরই ল‍‍ড়াই

মেঘবালিকা বলছি শোনো

তোমায় কানে কানে

রামধনুর সে রং ছড়াতে

আসছ কবে প্রাণে

গ্রীষ্ম বর্ষা সবই যেন

মনের বিলাসিতা

কিন্তু সবাই যুগিয়ে যায়

মনখারাপের ব‍্যথা

মনটা সদাই চায় সবুজ;

একরাশ করে ফুল  

কিন্তু ওরা বলছে তোমার

বাগানে শুধুই ধূল 

সব গিয়েছে চলে তোমার 

রোদ বৃষ্টিতে ঝড়ে

এখন কেবল গুনতে থাক

ক’টা ফুল গেল ঝরে

মনের আমি মনের তুমি 

যায়না কাউকে বাঁধা

মনের আকাশে রোদ বৃষ্টি

সদাই একটি ধাঁধা !

 


Saturday, July 11, 2020

আমাদের সেই কনকদা: শ্রী কনক অধিকারী

আমাদের সেই কনকদা

শ্রী কনক অধিকারী  (১৯৫২- ২০২০)

                                         শ্রী প্রসেনজিৎ দত্ত, আমেদাবাদ

         বিস্ময়ে হতবাক হতে হয়, যে এই দুর্ধর্ষ আবেগপ্রবণ বঙ্গসন্তানটি কোন ধনীর দুলালের ঘরের নন। নেহাতই দুবেলা দু'মুঠো শাকান্ন জোটানো ঘরের ছেলে। শ্রী কনকদাস অধিকারী। চাল ফুটো হয়ে যে ঘরে, ঝড়ে পড়ে বর্ষার বারিধারা, সেই মাটির ঘরে, সেই দীনের ঘরে, জন্ম ১৯৫২ সালের ২৩শে অক্টোবর। বাবা জগন্নাথ অধিকারী। মা গৌরীদেবী। পাঁচ ভাই এক বোনকে নিয়ে ভরা সংসারে কনকদা বড় ছেলে। ছেলেবেলা থেকেই দায়িত্ব আর কর্তব্যে অবিচল। ত্যাগবরণের জন্য প্রতিনিয়ত প্রস্তুত থাকা কনকদার জীবনের একটা অন্যতম রুটিন। পশ্চিম মেদিনীপুরের লোকপীঠ গ্রামের স্থানীয় স্কুলে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা। সালটা বোধকরি ১৯৬৫-৬৬। মামার বাড়ির কিছু অংশ পেয়ে বিরাট এক মাটির বাড়ি তৈরি করে রাধামোহনপুরে উঠে এল অধিকারী পরিবার। কনকদা রাধামোহনপুরের বিবেকানন্দ হাইস্কুলে ভর্তি হলেন। সংসারের অভাব মেটাতে পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে গৃ্হশিক্ষকতা, এমনকি মাটি কাটার কাজও করতে হত। উচ্চ-মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হবার পর মেদিনীপুর টাউনে স্নাতক স্তরে ভর্তি হন। প্রতিদিন ১৫ কিমি সাইকেল চালিয়ে যেতে হত। অদম্য জেদ আর লড়াই।

    ১৯৭৬ সাল। ওয়েস্ট বেঙ্গল বস্ত্রবিপনী 'বঙ্গশ্রী'র কাজে কনকদা মাত্র ৭ দিনের জন্য আমেদাবাদ আসেন। ১৯৭৭ সাল থেকে পাকাপাকিভাবে আমেদাবাদে 'বঙ্গশ্রী'র নতুন শোরুমের ম্যানেজারপদে। নিজ কর্মদক্ষতায় 'বঙ্গশ্রী'র মতো একটি বঙ্গপ্রতিষ্ঠানকে আমেদাবাদ শহরে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পুলিশ ও প্রাথমিক শিক্ষকতার চাকরী প্রত্যাখ্যান করেন। 'বঙ্গশ্রী'তে চাকরীর সাথে সাথে মর্নিং কলেজ করে গুজরাত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হন।

    সেই সময় 'বঙ্গশ্রী' ছিল বাঙালিদের আড্ডার স্থল। সেখান থেকেই বেঙ্গল কালচারাল এসোসিয়েশনের সঙ্গে সখ্যতা এবং জড়িয়ে যাওয়া। এরপর কনকদা কর্মকুশলতার  জন্য গুজরাত 'হস্তকলা-হাট'এর উচ্চপদে আসীন হলেন। আবার নতুন চ্যালেঞ্জ। গুজরাত সরকারের চাকরী। কনকদার পরামর্শে এবার কোলকাতায় খোলা হল গুজরাত 'হস্তকলা-হাট'এর নতুন শাখা। আসলে মানুষটা চ্যালেঞ্জ নিতে ভালবাসতেন।

             নিজের রান্না নিজেই করা, আর বন্ধুদের সাথে হৈ-হল্লা করে জীবন বেশ কাটছিল। কিন্তু অবসন্ন প্রহরে, নারীর হৃদয় পাওয়ার নেশা ধরাতো পলাশকুঞ্জে। ঠিক এমন সময়ে কনকদা'র জীবনে প্রবেশ সম্ভ্রান্ত গুজরাতি ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে ভারতী ব্যাস। প্রণয় থেকে পরিণয়। শুভবিবাহ ১৯৮১ সাল, ১১ই মে। বৌভাত লালদরওয়াজার এসোসিয়েশন কক্ষে। বিয়ের পর কনকদা ভারতীবৌদিকে একটি শর্ত দিলেন যে, " আমার মা গ্রামের বাইরে খুব একটা কোথাও যান নি। তোমাকে বাংলা শিখতে হবে।" ভারতীবৌদি বাধ্য ছাত্রীর মত খুব অল্পদিনেই বাংলা বলা রপ্ত করে নিলেন। স্ত্রীকে শুধু নির্দেশ দিয়ে নয়, স্ত্রীকে খুশি করতে কনকদাও খুব দ্রুত গুজরাতি ভাষা শিখে নিলেন।

    কনকদা একটি ব্যতিক্রমী এবং উদ্দমী চরিত্র। এসোসিয়েশনে ১৯৯৪ সালে কোষাধ্যক্ষপদে এবং ১৯৯৬ সালে সম্পাদক। মাঝে কিছু বছর বাদ দিয়ে (২০০৪-২০) একনাগাড়ে ১৬ বছর এসোসিয়েশনকে একেবারে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া। দূরদর্শিতা, আত্মবিশ্বাস, প্রখর স্মৃতিশক্তি, পরোপকারী, অদম্য ইচ্ছাশক্তি, সৎ ,ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ। নেতা হওয়ার সমস্ত গুণ কনকদার মধ্যে বিদ্যমান ছিল। যিনি ৬ ঘন্টা ঘুম বাদ দিলে ১৮ ঘন্টা এসোসিয়েশন আর কালীবাড়ীর কথাই ভাবতেন।

    গ্রামের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া কেলেঘাই নদী, সোনার ধানের ক্ষেত পাশে রেখে, সবুজ সবুজ শাপলা শালুক ঝিল পিছনে ফেলে, গোধূলির রক্তরঙ  পশ্চিম দিগন্ত, আর সন্ধ্যার জ্যোৎস্নাভরা প্রান্তর ছেড়ে -- সেই গ্রাম্য ছেলেটি একদিন স্বপ্ন দেখিয়েছিল আমেদাবাদের বাঙালিকে। স্বপ্ন তো সবারই থাকে অন্তরে। কিন্তু শুধু স্বপ্নদেখানো নয়, বাস্তবে তা করে দেখিয়েছিলেন কনকদা। আমেদাবাদ শহরে বঙ্গজীবনে কনকদা ছিলেন একটি উজ্জ্বল গতিময় আলোকশিখা। যে আলো ফুটেছিল রূপ হয়ে, তা কেবল বহিরঙ্গে ছিল না, তার অন্তরেও ছিল এক প্রজ্জ্বল প্রদীপের শিখা -- বেঙ্গল কালচারাল এসোসিয়েশনের জন্য। আজীবন দীপ্ত হয়ে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে নিবেদন করে গেছেন। সত্যিই  এমন জীবন বিরল, যে সর্বাংশে ধুপের স্নিগ্ধ সুগন্ধ  দিয়ে গেল শুধুমাত্র বেঙ্গল কালচারাল এসোসিয়েশন আর কালীবাড়ী নির্মাণে।

    চলার পথে অনেক মানুষ পেয়েছিলেন যারা তার স্বপ্নকে তরান্বিত করতে সাহায্য করেছিলেন। এই স্বল্প পরিসরে তাদের সবার নাম উল্লেখ করা সম্ভব নয়। তবুও কয়েকজনের কথা না বললেই নয়। একেবারে শুরুর দিকে শ্রী রবি দত্ত,পরের দিকে শ্রী প্রবীর বাসু (IAS), শ্রী প্রভাত ঘোষ (IAS), শ্রী শিবশঙ্কর চ্যাটার্জী, শ্রী শম্ভুনাথ চক্রবর্তী, শ্রী খগেন গুহরায়, শ্রী সমীর সেনগুপ্ত প্রমুখ।

             বহু মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস ব্যতীত কালীবাড়ী নির্মাণ প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু যে দুজন মানুষের ভূমিকা সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য তাদের মধ্যে একজন কনকদা, অপরজন অনলদা। অনল মুখার্জী। কনকদার গত ৩৬ বছরের ছায়াসঙ্গী। কনকদার চরিত্রের বজ্রকাঠিন্যের অন্তরালে নিহিত ছিল এক কুসুম কোমল হৃদয়। বারবার আমরা তা প্রত্যক্ষ করেছি। কতবার কনকদা তার পরম বন্ধু, এসোসিয়েশনের মঞ্চে তার অন্যতম সহকর্মী  অনলদার কথা বলতে গিয়ে শিশুর মতই হাউ হাউ করে কেঁদেছেন।

    কনকদা ছিলেন পুরোদস্তুর মনেপ্রাণে বাঙালি। দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকা সত্বেও বাংলা ভাষা, বাংলা খাওয়াদাওয়াতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। কনকদার মধ্যে একটা শৈল্পিক দিকও ছিল। মাত্র কয়েক বছর আগের ঘটনা। কালীবাড়ী প্রাঙ্গণে রবীন্দ্র-জয়ন্তী উৎসব। কনকদা বলল,"চল,এবার মঞ্চ সাজাব ছাতিম (সপ্তপর্ণী) গাছের পাতা দিয়ে। ছাতিমতলা, শান্তিনিকেতন , রবিঠাকুর। অন্তরের সম্পর্ক। কি বল।" বিকেলে আমাকে নিয়ে গাড়িতে  বেরোলেন। পথের ধারে ছাতিম গাছের পাতা কেটে নিয়ে এলাম। বাঁশ কেটে মঞ্চের পিছনে দেওয়াল তৈরি করে ছাতিমগাছের পাতা জুড়ে দেওয়া হল। মাঝখানে রবিঠাকুরের ছবি। সেবার কনকদার ভাবনায় তৈরি হল এক অভিনব রাবীন্দ্রিক পরিবেশ।

    বর্তমান আমেদাবাদে আসতে থাকা নতুন বাঙালি জানুক, নিজের জন্য নয়, সকলের জন্য কেমন করে একটি প্রাণকে ফুলের সুগন্ধের মতো ছড়িয়ে দিতে হয় এবং বেঁচে থাকার প্রকৃত সার্থকতা কিভাবে নিহিত থাকে।

    ১৬ই মার্চ ২০২০। বাঁধন গেল ছিঁড়ে। পাখি গেল উড়ে, মুক্ত গগনে। সুখময় নীড় রইল পড়ে। যে নীড়ে পড়ে রইল স্ত্রী, দুই পুত্র,পুত্রবধূ আর অতি আদরের নাতনি। পড়ে রইল গ্রামের বাড়িতে অশীতিপর বৃদ্ধা মা, ভাইরা, বোন এবং অন্যান্য আত্মীয়স্বজনরা। পড়ে রইল সাধের কালীবাড়ী। আর পড়ে রইলাম আমরা তার অগণিত কাছের  মানুষ।

 "তোমাকে হারিয়ে আমরা মেনেছি,

নিয়তির কাছে হার।

ভুলিনি কিছুই স্মৃতিগুলি তব,

মনে পড়ে বারবার।"


Wednesday, July 8, 2020

ভাষা তুমি কার?

ভাষা তুমি কার?

ডা০ (ক্যাপ্টেন) দিলীপ কুমার সিন্‌হা, পাটনা

        সৌমিত্র সিংহ। মাতৃ ভাষা বাংলা। পিতার কর্মসূত্রে বিহারে জন্ম। বিহারে শিক্ষা। বিহারে চাকরী। বিহারে বিয়ে। অবশ্যই প্রেম করে। বাঙালি মেয়ে। বাংলা ছাড়া অন্য ভাষায় প্রেম নিবেদনের কথা বোধহয় ভাবতে পারেন নি। বিহারে বাড়ি করেছেন। কিন্তু মনে প্রাণে বাঙালি। বাংলায় গান শোনেন। বাংলা খবর কাগজ পড়েন। বাংলায় কথা বলতে ও মাতৃভাষার সপক্ষে কথা বলতে ভালবাসেন। বলেন পরদেশে নিজের মাতৃভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে যুদ্ধ করতে হলে করবেন। গর্দান দেবেন কিন্তু ভাষা দেবেন না।

ছেলে বিহারেই পড়েছে। সময়ের তাগিদে ইংরাজী মিডিয়াম স্কুলে শিক্ষা শুরু হোয়েছে। সেখানে বাংলা পড়তে হয় নি শুধু ইংরাজি ও হিন্দি পড়তে হয়েছে তবে সৌমিত্র সিংহ ছেলের হাতেখড়ি করিয়ে বিদ্যাসাগরের বর্ণ পরিচয় সামনে রেখে অ আ ক খ শিখিয়েছিলেন। বাংলায় কমিক বই কিনে দিয়েছেন। বাংলার অক্ষর চিনিয়ে চিনিয়ে গল্প শুনিয়েছেন। অলিখিত আদেশ ছিল যে বাইরে যে ভাষায় কথা বলুক না কেন বাড়িতে বাংলায় কথা বলতে হবে। বাড়িতে শুধু বাংলা ভাষা শুনে ও  কথা বলে, ছেলে পরিস্কার বাংলায় কথা বলতে পারে, ঠেকে ঠেকে বাংলা পড়তে আর নিজের নাম বাংলায় লিখতে পারে।

       এতদিন পর্যন্ত ঠিক’ই চলছিল। তবে মুস্কিল বাঁধল ছেলে যাকে বিয়ে করল তার নাম রমা, একসঙ্গে পড়ত, একই অফিসে কাজ করে তবে মাতৃভাষা হিন্দী। জোড়ে প্রণাম করতে এসে  পুত্রবধু বলল, - "মেরা  মাতৃভাষা তো হিন্দী হৈ, মুঝে বাংলা বোলনা নহি আতী, লেকিন মুঝে  শিখা দেনেসে মৈঁ বাংলা মেঁ হী বাত করুঙ্গি। অন্য কেউ হলে হয়ত খুশি হতেন যে ছেলের নিজের পছন্দ’তে আনা পুত্র বধু স্বেচ্ছায় নিজের মাতৃভাষা পরিত্যাগ করতে রাজি আছে। কিন্তু মাতৃভাষা প্রেমী সৌমিত্র সিংহের এই প্রস্তাব পছন্দ হল না। তাঁর মতে নিজের মাতৃভাষা’কে ভালবাসার মানে নয় অন্য মাতৃভাষাকে মুছে দেওয়া। তাড়াতাড়ি পুত্রবধুর হাত ধরে বললেন- "না মা, তুমি নিজের মাতৃভাষাকে ছাড়বে কেন। তুমি তোমার মাতৃভাষাতে কথা বল আমরা আমাদের মাতৃভাষায় কথা বলব। আমার মনে হয়না কোন অসুবিধে হবে।" দুজনেই হেঁসে উঠলেন। বোধ হয় ঈশ্বরও হাঁসলেন। সৌমিত্র সিংহের বাড়ির অন্দরমহলে তাঁর মাতৃভাষা বাংলা কে একটু জায়গা পুত্রবধুর ভাষাকে ছাড়তে হল।

       হয়ত বউ’কে খুশি রাখতে বা সহকর্মী বৌএর উপর নিজের কর্তৃত্ব না ফলাতে বা অভ্যাস মত, ছেলে নিজের বউএর সাথে হিন্দীতেই কথা বলে। বাবা মাএর সঙ্গে দরকারী কয়েকটা কথা বলা ছাড়া ছেলের আর বাংলা ভাষায় কথা বলার সুযোগ হয়না। ছেলের বিয়ের আগে সকাল সন্ধ্যে চা খাবার সময়ে তিনজনে বেশ গল্প হত। বাংলাতেই হত। রবিবারে রাত্রে টিভি তে বাংলা সিনেমা দেখা হত। ইদানিং দুটো দল হয়ে গ্যেছে। পুরান স্বামী স্ত্রী শোবার ঘরে বসে চা খান, আনন্দ বাজার খবরের কাগজ পড়েন, আর বাংলায় জী টিভি দেখেন।  আর অফিস ফেরত নতুন স্বামী স্ত্রী নিজেদের বেডরুম’এ চা খান আর হিন্দি সিনেমা বা সিরিয়াল দেখেন। দুই ভাষার দুই গ্রুপ, কোন দ্বন্দ নেই, সহজ সহঅস্তিত্ব। বিশেষ কোন অসুবিধে হচ্ছিল না।

বছর দুএক এ ভাবে কাটল। হটাৎ একদিন বিকেলে, তাঁদের পুত্রবধু রমা ও ছেলে, বিকেলে বার হল একটু সেজেগুজে। শাশুড়িকে বলে গেল যে মন্দিরে যাচ্ছে পুজো দিতে, একটা ভাল খবর আছে এসে জানাবে। ফিরল ঘন্টা খানেক পরে। বেশ হাঁসি খুশি সঙ্গে বড় প্যাকেটে সন্দেশ। এসেই শ্বশুর শাশুড়ির পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করল। ছেলে সন্দেশের প্যাকেট টা বাবার দিকে এগিয়ে দিযে বলল - "তুমি সন্দেশ ভালবাস, যটা ইচ্ছে খেয়ে নাও, রাত্রে ডায়াবেটিস এর ট্যাবলেট একটা বেশি খেয়ে নিও।" আনন্দে ডগমগ রমা তাড়াতাড়ি নিজের স্বামী’কে একদিকে টেনে বলল "আরে বাবা কো বতাইয়ে না কি ওয়ে দাদা বন্নে বালে হৈঁ"। সোমিত্র সিংহ ব্যাপার কিছুটা আঁচ করেছিলেন। এখন সানন্দিত পুত্রবধুর মাথায় হাথ রেখে আশীর্বাদ করে বললেন - "ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি তোমার সন্তান সুস্থ হোক, আয়ুষ্মান হোক, বিদ্বান হোক তবে আমি তো দাদা  হতে পারব না মা, কারণ দাদা একজনই, সে সৌরভ গাঙ্গুলী, তবে আমি দাদু হব। সবাই হেঁসে উঠল।

        সেদিন থেকে হটাত বাড়িতে জাদু হয়ে গেল। আজকাল কেউ একলা বসে না। সবাই এক সঙ্গে বসেই কথা বলে, সবাই নিজের পছন্দমত, আগামী দিনগুলি সাজাতে থাকে। হবু দাদু তাঁর ছেলের জন্মের সময় কি করেছিলেন তার গল্প শুরু করে দেন। প্রথমে শুরু করেন বাংলাতে, কিন্তু বৌমার উপর চোখ পড়ে গেলে হিন্দিতে বলা শুরু করেন।

       দিন সপ্তাহ মাস কেটে যেতে লাগল। হটাৎ একদিন দাদুর মনে একটা চিন্তা এসে ঢুকল। তার দ্বিতীয় প্রজন্ম কি ভাষায় কথা বলবে? নিজের মাতৃভাষা না তাঁর মাতৃভাষা। প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে সে তার মাতৃভাষাতেই বলবে। তাহলে কি তাঁর আর তাঁর স্ত্রীর অবর্তমানে এই ঘর থেকে বাংলা ভাষা শেষ হয়ে যাবে? কিছু কি করা যায়না যাতে আগত শিশু তাঁর পিতৃ পুরুষের ভাষা, বাংলা ভাষা, অন্তত বুঝতে ও বলতে পারে? এই সবের উপায় ভাবতে ভাবতে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ ও এসে গেল যেদিন সন্ধ্যা বেলা বৌমা কে নিয়ে সৌমিত্র সিংহ, তাঁর স্ত্রী, ও ছেলে নার্সিং হোমে গেলেন৷ পরদিন সকালে সুন্দর ফুটফুটে নাতনি কে কোলে নিয়ে ফিরলেন। তারপর স্বপ্নের মত ছমাস কেটে গেল।

       প্রায় প্রতিদিনই ঘর ভর্তি লোক, তাঁর স্ত্রী ও তিনি ছাড়া হাতে গোনা কয়েক জন মাত্র তাঁর নাতনিকে বাংলাতে সম্বোধন করে। সৌমিত্র সিংহ কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারছিলেন না যে কিভাবে অবাংলা ভাষার আধিক্যের এই পরিবেশে শিশুর বোধশক্তির মাঝে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করা যায়। একদিন তাঁর স্ত্রী, নাতনি কে তাঁর কোলে দিয়ে বললেন "নাও নাতনি কে চুপ করাও ত, কেঁদেই চলেছে"। সাগ্রহে কোলে নিলেন, দোল দোল করলেন কিন্তু নাতনি তবু  চুপ করে না। তাঁর স্ত্রী দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। হেঁসে বললেন শুধু দোলালে হবেনা একটু গান টান গাও। স্ত্রীর কথা শুনে হটাত মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। তিনি মোবাইল বার করে, গুগুলে গিয়ে "চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে কদম তলায় কে, হাতি নাচছে ঘোড়া নাচছে সোনামনির বিয়ে" রাইম টা বাজিয়ে বার বার শোনাতে লাগলেন। আশ্চর্য তাঁর নাতনি চুপ করে গেল আর তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল। তাঁর স্ত্রী দুধের বোতলটা দিয়ে বললেন মুখের কাছে ধরত, দুধ টা খেয়ে নিতে পারে। সত্যিই দুধ টানতে লাগল। দুধ শেষ করে উম আম করে দাদুকে কিছূ কথাও বলল। সৌমিত্র সিংহ বুঝতে পারলেন রাইমস বা ইন্সট্রুমেন্টস এর ছন্দ, নাতনির মস্তিস্কের কোন জায়গায় একটা কমফোর্ট জোন তৈরি করতে পেরেছে আর এই যদি  সত্যি হয় তাহলে হয়ত এই পথেই নাতনির বোধশক্তির মাঝে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারবে। সেদিন রাত্রে সৌমিত্র বাবু নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমালেন। পরদিন থেকে শুরু করলেন মনে করতে ছোটবেলাকার ভুলে যাওয়া ছড়া গুলোকে তারপর তাদের রেকর্ড যোগাড় করতে বা ইউটিউব এ খুঁজতে। নিজের মোবাইলে ডাউনলোড করলেন আতা গাছে তোতা পাখি ডালিম গাছে মৌ, খোকন খোকন করে মায়ে, আয়ে রে আয় টিয়ে নায়ে ভরা দিয়ে, তাই তাই তাই মামা বাড়ি যাই, হাট্টিমাটিম টিম। নাতনি কে দুধ খাওয়ান আর তাকে গান শোনান সৌমিত্র বাবুর নেশা হোয়ে দাঁড়াল।

       একদিন নাতনি তার মায়ের কাছে দুধ খাবে না আর দুদু দুদু বলে কান্না জুড়ে দিয়েছে। তার মা তাড়াতাড়ি তার মোবাইলে হিন্দি রাইম খোজা শুরু করল খুঁজে পেল 'চন্দা মামা দূরকে পুরী পকায়ে গুড়কে' কিন্তু সৌমিত্র বাবুর নাতনির কান্না বন্দ হয় না ওর মাথায় ত দুধের স্বাদের সঙ্গে 'চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে', ঘর করে আছে। অফিসের সময় হয়ে যাচ্ছে আর কতক্ষন বাচ্চার জিদের সঙ্গে লড়বে? দুম দুম করে এসে দাদুর কাছে বসিয়ে বলল - "বাবা আপ মোবাইল সে বাংলা গানা শুনাতে শুনাতে ইসকা আদত করওয়া দিয়ে হৈঁ। আওউর কুছ সুনানেসে শুনতা নহি হৈঁ। কেওল বাংলা গানা কা আদত বন জানে সে, ফির তো মেরে বেটি মেরে সাথ বাত হি নহী করেগী"। সৌমিত্র বাবু চুপ করে শুনলেন। তারপর হাত জড়ো করে বললেন "না মা তোমার ভয় নেই, সন্তান মাতৃভাষা শিখবে না এমন সম্ভব হতে পারে না। তোমার মুখের ভাষা শুনেই তো সন্তান ঘুমাবে, তোমার মুখের ভাষা শুনেই তার ঘুম ভাঙ্গবে। তোমার ভাষাতেই সে স্বপ্ন দেখবে। তুমি যদি তোমার ভাষা না বদলাও, তোমার সন্তান কি কখনো তোমার ভাষা ভুলতে পারে? আমি’ ত শুধু তার অন্তরমনে, তার পিতৃ ভাষার জন্যে কিছু স্থান তৈরি করার চেষ্টা করছি। আমার হারিয়ে যাবার ভয় আছে, তোমার সে ভয় নেই"।

দাদুর ছড়ার ভান্ডারে এবার থেকে বাংলার সাথে তাল বজায় রাখতে কিছু হিন্দি ছড়াও যোগ হল 'মছলী জল কি রানী হৈ জীবন উসকা পানি হৈ' অথবা 'অক্কর বক্কর বম্বে বো অস্সী নব্বে পুরে সৌ'। দাদুর সোনা মনির সব ছড়াই ভাল লাগে তবে দুধ খেতে গেলে কিন্তু চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে চাইই চাই। সবাই হাঁসত আর বলত মেয়ের বুদ্ধি ভাল, এখন থেকেই বিয়েতে কি কি হবে ঠিক করে রেখেছে।  বছর তিনেক বয়েস হল। সোনা মনির মাথার মধ্যে ছোট ছোট শব্দ গুলি তৈরী হচ্ছে, তাই দিয়ে  ফুট ফুট কথা বলে দাদুর সঙ্গে। সৌমিত্র বাবু নাতনির সঙ্গে বাংলাতেই কথা বলেন আর নাতনি নিজের পছন্দ মত শব্দে উত্তর দেয়। বাংলা কি হিন্দি বলা শক্ত। তবে মা বাবা আর আয়ার কাছ থেকে নিরন্তর হিন্দি শুনতে শুনতে, নিজের মনের অভিব্যক্তি গুলি ব্যক্ত করতে হিন্দি শব্দ গুলিই অবচেতন ভাবে জীভের কাছে চলে আসতো তাই হিন্দির টান টাই বেশি থাকত।

সোনামনির কিন্ডারগার্ডেনে ভর্তি হবার বয়স এসে যাওআর সঙ্গে সঙ্গে যোগ হল আর এক নতুন ভাষা। শেখান শুরু হল, 'হোআট ইজ ইয়োর নেম, হোআট ইজ ইয়োর ফাদার্স নেম, হোআট কালার ইজ দিস'। ছোট্ট মেয়ের ছোট্ট মাথায় মাতৃ ভাষা হিন্দি, পিতৃ ভাষা বাংলা ও সভ্য স্কুলের ভাষা ইংরিজি, নিজের নিজের স্থান স্থির করবার চেষ্টায় বেচারী’কে প্রায়ই অস্বস্তিতে ফেলে দিত। মাঝে মাঝে তাই দাদু ও থাম্মার কাছে এসে কোল ঘেঁসে বসে বলত "দাদু চাঁদওয়ালা গানা শুনাও তো"। তারপর চলত দাদু থাম্মা আর  নাতনির আড্ডা। ভাষাবিদদের এই আড্ডায় ঢোকা মানা ছিল।

এখন আদরের নাতনির বয়স হল পনের বছর অনেক বন্ধু, অনেক পড়া,  তিনজন টিচারের কাছে টিউশন নিতে যেতে হয়, আশি বছরের দাদু আর আঠাত্তর বছরের থাম্মার সঙ্গে আর আড্ডা মারার সময় পায় না, তবে সকালে গুড মর্নিং আর রাত্রে শোবার আগে সুইট ড্রিম নিশ্চয় করে বলতে আসে। কখনো যদি হটাৎ কিছুক্ষণ  কথা বলার আয়েসি সময় পওয়া যেত তাহলে তা হত  আশি ভাগ ইংরেজি, উনিশ ভাগ হিন্দি আর হয়ত এক দুটি শব্দ বাংলায়।  সৌমিত্র বাবু বুঝেছিলেন যে, মানুষ যে ভাষা দিনের পর দিন বেশির ভাগ সময়ে শুনবে ও ব্যবহার করতে বাধ্য হবে, তার মস্তিষ্ক তার ভাবকে ব্যক্ত করতে সেই ভাষাকেই যুগিয়ে দেবে, সেই ভাষাতেই সম্পৃক্ত হবে, এই সত্য আর এর থেকে মুক্তি নেই। তবু মাঝে মাঝে ভাবতেন তাঁর মাতৃভাষাকে পরের প্রজন্মের মনের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখার তাঁর এত প্রচেষ্টা কি তবে ব্যর্থই গেল? এই কথাটা তাঁর মনে এলেই বুকের কাছে কেমন যেন  লাগত।

সৌমিত্র বাবু ডায়বেটিক ছিলেন। মাঝে মাঝে রাত্রে ভুলে দুবার ওষুধ খেয়ে ফেলতেন, আর ব্লাড সুগার কমে যাওয়া তে অজ্ঞানের মত হয়ে পড়তেন। সেদিন ভোরে হটাৎ বেশি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। পাশে শুয়ে থাকা থাম্মা সামলাতে পারছিলেন না। নাতনির নাম ধরে জোরে ডেকে উঠলেন, সোনামনি দৌড়ে এল, ছেলে পুত্রবধু দৌড়ে এল, তাড়াতাড়ি গ্লুকোজ গুলে বড় চামচে করে দাদুর গলার নিচে পর্যন্ত ঢেলে দিতে চেষ্টা করল, কিন্তু সৌমিত্র বাবুর মানসিক সচেতনতা অনেক কম হয়ে যাওয়াতে গিলতে পারলেন না। কোন কিছুই কাজ করছিল না। থাম্মা সোনামণির হাত ধরে বললেন তুমি ত দিদিভাই দাদুর প্রাণ ছিলে, তুমি চেষ্টা করে দেখ না একবার, তোমার ডাকে দাদু ফিরে আসে কিনা। সোনামণি  একবার থাম্মার দিকে তাকিয়ে দেখল তারপর হটাৎ দাদুর মাথাটা কোলে টেনে নিয়ে তাঁর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে জোরে জোরে গেয়ে উঠল "চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে কদম তলায়  কে ? হাতি নাচছে , ঘোড়া নাচছে সোনামনির বিয়ে, "কিছুই হল না,  দ্বিতীয় বার গাইল আরো জোরে, এবার মনে হল দাদুর চোখের পাতা একটু নড়ছে, আবার গাইল। হঠাৎ বড় চামচের গ্লুকোজ জলটা গিলে ফেললেন, তার পরে আরেক চামচ, তারপর আরো কয়েক চামচ। জ্ঞান একটু একটু করে ফিরে আসতে লাগল, পরিস্কার শুনতে পেলেন, খুব চেনা কোন গলা জোরে জোরে তাঁকে বলছে, "দাদু চোখ খোল, চোখ খোল,  তুমি ঠিক হয়ে গেছ,  মুখ খোল, জলটা খেয়ে নাও" দাদু আস্তে আস্তে চোখ খুললেন, নাতনিকে দেখলেন, মুখ হাঁসিতে ভরে উঠল। নাতনির হাত দুটো ধরে  আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন- কি দিদিভাই তুমি বাংলা ভোলনি? তুমি  বাংলা বলতে পার?" দিদিভাই দাদুভাইকে দুহাতে জড়িয়ে, বুকে মুখ  রেখে বলল "হ্যাঁ শুধু তোমার জন্যে”।

********


 বিহার বাঙালি সমিতি পূর্ণিয়া শাখার নবনির্বাচিত কমিটির প্রথম বৈঠক সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আজকের এই গুরত্বপূর্ণ সভায় উপস্থিত সকল সদস্যদের আন...