Sunday, October 18, 2020

বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন, দিল্লী

 

বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন, দিল্লী: "সাহিত্য পত্রিকা দিগঙ্গন উৎসব সংখ্যা" এবং পূর্ণাঙ্গ বই "লকডাউন নকডাউন, একটি সংকলন"

 








১৭ই অক্টোবর, ২০২০, শনিবার মুক্তধারা প্রেক্ষাগৃহে বিকেল ৫টায় একটি মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন, দিল্লীর পক্ষ থেকে বিশেষ বই "সাহিত্য পত্রিকা দিগঙ্গন উৎসব সংখ্যা" এবং পূর্ণাঙ্গ  বই "লকডাউন নকডাউন, একটি সংকলন" এর আবরণ উন্মোচন করা হল। বই দুটির আবরণ উন্মোচন করেন দিল্লীর বিশিষ্ট সাহিত্যিক মণিরত্ন মুখোপাধ্যায়ভারত সরকারের উচ্চপদস্থ আধিকারিক ও বাংলাসাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক শ্রী সুমন্ত ভৌমিক মহাশয় এবং সাংবাদিক ও সাহিত্যিক সমৃদ্ধ দত্ত।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশন করেন মৌসুমি আচার্য এবং শাশ্বতী গাঙ্গুলী।

এই অভিনব অনুষ্ঠানে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন অ্যাসোসিয়েশনের সহ সভাপতি তপন রায়, শ্রী উৎপল ঘোষ ও শ্রী সজল মিত্র।

এছাড়া উপস্থিত ছিলেন দিগঙ্গন সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক ব্রততী সেনগুপ্ত, বিশিষ্ট সাহিত্যিক শ্রী গৌতম দাসগুপ্ত এবং বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ডা: তপন মুখার্জী।

দীর্ঘ লকডাউন পরিস্থিতিতে বন্দী জীবনের প্রতিচ্ছবি ও তার প্রতিবিম্ব নিয়ে প্রকাশিত "লকডাউন, নকডাউন- একটি সংকলন" বইটির সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করেন শ্রীমতি জয়ন্তী অধিকারী ও শ্রীমতি পৃথা দাস।

এই কঠিন পরিস্থিতিতেও যাতে সাধারণ মানুষ শারদ উৎসবের দিনগুলিতে সাহিত্যের রসাস্বাদন করতে পারেন তার জন্য এই প্রয়াস। সেই লক্ষ্যে মুক্তধারার প্রেক্ষাগৃহে যথেষ্ট সংখ্যক সাহিত্যানুরাগী সমন্বয়ে এই অনুষ্ঠান সাফল্য অর্জন করেছে।

সমগ্ৰ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন শ্রী দেবাশীষ ব্যানার্জী।

সবশেষে সমগ্ৰ অনুষ্ঠানের সর্বাঙ্গীন সার্থকতার পরিপ্রেক্ষিতে সকলকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানান অ্যাসোসিয়েশনের  সাধারণ সম্পাদক শ্রী তপন সেনগুপ্ত।

প্রতিবেদন - তপন সেনগুপ্ত।

 

Bengal Club, Shivaji Park

 




Saturday, October 17, 2020

বিদ্যাসাগর: দেবাশীষ মিশ্র, জামতাড়া

 বিদ্যাসাগর

দেবাশীষ মিশ্র, জামতাড়া


এ বছর আমরা স্মৃতিরক্ষা সমিতি কোন আয়োজন করিনি, আমরা স্থানীয়, সমিতির সদস্যরা যাবো, মাল্যদান করব, ৬ জন ছাত্র- ছাত্রীদের পুরস্কার দিয়ে ফিরে আসবো এই কথা ছিল, পরে জামতাড়া জেলার DC সাহেব আসবেন কথা হোল, ঠিক ১০ টার সময়, সবাই উপস্থিত হলেন, যথারীতি অনুষ্ঠান হোল, খুব অল্প সময়ের মধ্যে। মিডিয়ার বন্ধুরা ছিল।

খবরের কাগজে খবর ছাপা হোল, কয়েকদিন পর বিকেলে আমি বিকালবেলায় বাড়ির থেকে একটু দূরে একটি পল্লীতে বেড়াতে গেলাম,  কি অবাক কান্ড!

একটি বটগাছ তলায় কয়েকজন বসে গল্প করছিল, তারা পরিচিত আমাকে দেখে খুশি হয়ে উঠলো, আমি তাদের গল্প গুজবে জমে উঠলাম।

একজন বলে উঠলো, আপনাদের গল্প আমরা করছিলাম। আমি জানতে চাইলাম কোন গল্প ?

ওরা বললে যে আপনারা বিদ্যাসাগরের অনুষ্ঠান করছিলেন, তার কথা, বিদ্যাসাগর একজন খুব বড় মানুষ ছিলেন, গরিবের বন্ধু ছিলেন, কত বড় পন্ডিত মানুষ। তিনি বিধবা বিবাহ আইন পাস করিয়ে কত দুঃখিনির দুঃখ দূর করেছিলেন, শুধু তাই নয়, নিজের একমাত্র ছেলের বিয়ে বিধবার সাথে দিয়েছিলেন, সমাজের কত উপকার করেছেন।

এখনকার লোকের মত নয় যে মুখে যা বলতেন তা করতেন না, উনি নিজের জন্য তাই করেছেন।

আমি ভীষণ অবাক হয়ে গেলাম, যারা বাংলা পড়েন না, যারা ভীষণ সাধারণ মানুষ, মূলত কৃষি  শ্রমিক, বাবু নয়, তারাও এই খবর রাখে !

আমি বাড়ি ফিরে শুধু ভাবতে শুরু করলাম ...

অনেকদিন ধরে আমরা অনুষ্ঠান করে আসছি, মানুষ এর মাঝে বিদ্যাসাগরকে পৌঁছে দিতে, কোন বাবু সমাজের মানুষ তো এই ভাবে চিন্তা করে না।

আমি ভাবতাম আমাদের এই প্রচেষ্টা কতদূর পৌঁছে গেছে, কিন্তু কোনদিন ভাবিনি যে এই সাধারণ মানুষ যারা বাঙালিও নয়, স্থানীয় বাংলা ভাষা ব্যবহার করে, কিন্তু কোনদিন বাংলা ভাষায় লেখাপড়া করেনি, সেই সাধারণ, গাছতলায় বসে বিদ্যাসাগর চর্চা করে, এ যেন পরম প্রাপ্তি !

এই সাধারণ সমাজের মাঝে আরো অনেক কাজ করার ইচ্ছে রাখতে হবে ....

 

Friday, October 16, 2020

দ্বিশত-জন্মবর্ষে বিদ্যাসাগর ও আমাদের মাতৃভাষা: মহীদাস ভট্টাচার্য্য শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী বুদ্ধিজীবী মঞ্চ, কলিকাতা

 দ্বিশত-জন্মবর্ষে বিদ্যাসাগর ও আমাদের মাতৃভাষা

 


মহীদাস ভট্টাচার্য্য

শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী বুদ্ধিজীবী মঞ্চ, কলিকাতা


বিশ্বের কোনো কোনো দেশে এমন কিছু মহাপ্রাণের আবির্ভাব ঘটেছে যাঁরা উত্তরকালের প্রজন্মকে বাধ্য করেন তাঁদেরকে অনুসরণ করতে। বাংলা-ভাষাভাষীর সৌভাগ্য তেমনি। ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এই রকম এক মহাপ্রাণ। মৃত্যুর ১৩০ বছর পরেও নবীন উৎসাহে বঙ্গভাষীরা তাঁর স্মৃতি সামনে রেখে নিজেদের চলার পথটি নির্ধারণ করতে উদ্যোগী হয় স্বত:স্ফূর্ত প্রাণের আবেগে। বহু প্রতিষ্ঠান বিদ্যাসাগরের দ্বিশতজন্মবার্ষিকী পালন করছে এই কারণেই।  নন্দন কানন উদ্‌যাপন কমিটি, কার্মাটাঁড়, অল ইণ্ডিয়া বেঙ্গলি এসোসিয়েশন, নিউদিল্লী, ঝাড়খণ্ড বাঙালি সমিতি ও বিহার বাঙালি সমিতি যৌথভাবে এইরকম একটি উদ্যোগ নিয়েছেন। সেই উদ্যোগে সামিল হয়ে বিদ্যাসাগর তর্পণের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য বাংলার শিল্পী-সাংস্কৃতিককর্মী-বুদ্ধিজীবী মঞ্চের সদস্য হিসেবে আন্তরিকভাবে গৌরব বোধ করছি, অনুপ্রাণিতও বটে।

 

ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বহুধাবিস্তৃত কর্মযোগে আপাতভাবে ভিন্নতা থাকলেও এগুলির মধ্যে একটি সমন্বয়ের যোগসূত্র রয়েছে। সেটি হলো তাঁর মানুষের প্রতি অসীম মমত্ব ও নতুন মানুষ গড়ার স্বপ্ন। সবার উপরে মানুষ সত্য এটি প্রতিষ্ঠা করার আত্মবিশ্বাস তাঁকে অস্থির রাখত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই। চঞ্চল থেকেছেন আমৃত্যু। সামন্তীসমাজের জাতিধর্ম নির্বেশেষে প্রান্তিক মানুষের জীবনযন্ত্রণার পেছনে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস ও সে বিষয়ে আমাদের অজ্ঞতা তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন কার্মাটরের আদি অধিবাসীদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে। প্রতিকারের সন্ধানও ছিল তাঁর কাছে। বিশেষ করে পাশ্চাত্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পরে। কিন্তু তখন তিনি জীবন সায়াহ্নে।

ইস্টইণ্ডিয়া কোম্পানীর হাতে দেশের শাসনভার চলে যাওয়ার পর শুরু হল একটা অস্থিরতার যুগ। ব্যক্তি-মানুষের অস্তিত্ব নতুনরূপে প্রকাশ পেতে চাইছিল।  সমাজ অভ্যন্তরে এই অস্থিরতার কালে বাংলার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে এসেছিলেন নতুন নাগরিক সভ্যতায়, যেখানে দুরাচার অনাচার, ব্যভিচার, নীতিহীনতার আধারেই গড়ে ওঠা বাবু-সংস্কৃতিতে ব্যক্তিকে আকণ্ঠ ডুবিয়ে রেখেছিল। অন্যদিকে সমাজমননে প্রাধান্য পেয়ে আছে অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার, ইসলামী ভাবনা ও ব্রাহ্মণ্যবাদের আধিপত্য, বর্ণবিদ্বেষের দ্বন্দ্ব ইত্যাদি । এই অবস্থায় ফরাসীবিপ্লবের উত্তর কালের কোলকাতার নতুন নগর সভ্যতায় তাঁর আগমন। পুরানো সবকিছুকে ভেঙ্গে নতুন কিছু একটা গড়ে উঠতে চাইছে সমাজ অভ্যন্তরে। তারই আকুতি অনুভব করেছিলেন গভীরভাবে কৈশোরে হিন্দুকলেজ ও স্কুল পরিবেষ্টিত সংস্কৃত কলেজের ছাত্রজীবনে। প্রাচ্যের পরিপূর্ণতার পাশে পাশ্চাত্যের ভাবনার একটা আঁচ পেয়েছিলেন। শিক্ষা অর্জনের উত্তরকালে সেগুলিই তাঁর জীবনের আদর্শের ভিত হিসেবে কাজ করেছিল। প্রাচীনত্বের বেড়াজাল থেকে পেরিয়ে তিনি আধুনিক মানুষ তৈরির কর্মযজ্ঞে ডুবে গিয়েছিলেন। 1841 থেকে তার যাত্রাশুরু যার পরিসমাপ্তি 1891-এ, জীবনের প্রায় শেষদিন পর্যন্ত। কার্মাটরের কর্মযোগ অন্তিম পর্বে।

কার্মাটরের জীবনের পেছনে নানাজন নানামত প্রকাশ করেছেন। প্রমথনাথ বিশী মনে করতেন “ঘরে বাইরে আঘাতে তিনি নাকি মানুষ সম্পর্কেই অনাস্থাবাদী বা সিনিক হয়ে ওঠেন; মানববিদ্বেষী মিস্‌আ্যানথ্রোপ বললেও ভুল হয় না।” সুমিত সরকারের মতো ঐতিহাসিকও মনে করেন –বিদ্যাসাগরের শেষজীবনে কার্মাটরেই কাটিয়েছেন, সাঁওতালরাই ছিলেন তাঁর একমাত্র সঙ্গী।“ (রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য্য, ২০১১)। আসলে ব্যাপারটা তা নয়। এ কথা ঠিক যে তিনি তাঁর জীবনের শেষকটা দিন সাঁওতালদের মধ্যে, এ দেশের আদি অধিবাসীদের কাছে এক নতুন প্রাণের সন্ধান পেয়েছিলেন । কিন্তু কলিকাতার মুখ্য কর্মযজ্ঞের বাইরে থেকে তা নয়।

বিরক্ত হয়েছিলেন পরিবারের সদস্য, বীরসিংহের প্রতিবেশি, কোলকাতার বন্ধু ও সহযোগীস্থানীয়দের একাংশ,  দেশবাসীর একাংশের উপরেও। কারণ তারা সঙ্কীর্ণ সামন্তীমনোভাবাশ্রিত কুশ্রীতা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য চেষ্টাই করেনি। যেমন আজকের এই বিশাল দেশে একটা বিরাট অংশের মানুষ ধর্মীয় নিরপেক্ষতার সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে মেতে উঠেছে ধ্বংসের কর্মযজ্ঞে। তেমনি সেদিন বঙ্গবাসীর একটা অংশ সঙ্কীর্ণতাকে আশ্রয় করে উপকৃত হয়েও প্রবঞ্চিত করেছিল তাঁকে, সমাজের প্রয়োজনে কর্তব্যকে উপেক্ষা করেছিল। সঙ্কীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থের উর্ধে উঠতে পারেনি। এতে তিনি যদি মানববিদ্বেষী হতেন তাহলে 1864-র মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশান, যেটি 1872-এ কলেজে রূপান্তরিত হয়, সেই প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক কর্মযজ্ঞে তাঁকে পাওয়া যেত কি? কার্মাটর ও কোলকাতা দুটোই নিত্য কর্মযোগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন তিনি। সফল হয়েছিলেন তাতে। বিদেশি শাসকের আধিপত্যের বাইরে এসেও শিক্ষা সংস্কারে তাঁর উদ্যোগের সঠিকতা প্রমাণ করতে। মেট্রোপলিটনকে গড়ে তুলেছিলেন শিক্ষিত দেশীয়দের নিয়ে। বিদেশীদের সাহায্য ব্যতিরেকেই সফল করে তুলেছিলেন সেই যুগে। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন বিদেশি রেজিস্ট্রার বলতে বাধ্য হয়েছিলেন The Pundit has done wonders। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় বলেছিলেন সত্যিকারের জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এই সময় তিনি কার্মাটরের জীবনের মধ্যেও ছিলেন। আরও নানা ঘটনা প্রমাণ করে তাঁর উভয়স্থলে কর্মযোগের ব্যাপ্তি। জীবনের শেষ মুহূর্তে নারায়ণ তাঁর কাছে ‘কী কষ্ট হচ্ছে’ জানতে চাইলে তিনি উত্তর দেন “দু:খ হচ্ছে মেট্রোপলিটন স্কুল ও কলেজের শিক্ষকদের জন্য, চাকুরীজীবন অন্তে গ্রাসাচ্ছাদনের কোনও ব্যবস্থা করে যেতে পারলাম না।“ (ইন্দ্রমিত্র, ২০১৬, ৫৮২)

কার্মাটরের মানুষের সঙ্গে তাঁর পরিচিতি দেশের প্রান্তিক জীবনের সঙ্গে পরিচয় ঘটিয়ে দিয়েছিল।  সেটি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ মনুষ্যত্ব ও  মমত্বের অসীমতার অনুরণন মাত্র। চঞ্চল করেছিল। বুঝেছিলেন ভারতীয় আর্য-আধিপত্যবাদী ও ইসলামী সামন্তীশাসক অধ্যুষিত সমাজ দেশেরই একদল মানুষকে অতি প্রান্তিকবাসী করে দিয়েছে। কার্মাটরে তাদেরই বাস। নতুন সভ্যতার বিকৃতি নগর ছেড়ে এই প্রান্তিক মানুষকে স্পর্শ করতে পারেনি। তাই তাদের সঙ্গে কাল কাটাতে চেয়েছিলেন তিনি। এটি তাঁর কর্মযোগে একটি নতুন সংযোগ। নগর কোলকাতায় সেদিন আজকের দলীয়-গণতন্ত্র গড়ে উঠেনি। ব্যক্তি বিদ্যাসাগর তাঁর কর্মযোগের ক্ষেত্র হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন কার্মাটরকে। গড়ে তুলেছিলেন প্রান্তিক মানুষের মনন ও জীবনের সঙ্গে অতিপরিচিত  মানবপ্রীতির আদানপ্রদান। পরিপূর্ণতা পেয়েছে তাঁর কর্মযোগ। এখানকার সাঁওতাল ও প্রান্তিক অধিবাসীদের মধ্যেও তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন নতুন মানুষ তৈরির। গড়ে তুলেছিলেন স্কুল, মেয়েদের জন্যও। সান্ধ্য স্কুল। সেবায় ছিলেন কার্পণ্যহীন, সহায়তায় আজকের পুণ্যলোভাতুরদের মতো নয় মানবদরদী মন নিয়ে সময় অতিবাহিত করেছেন আনন্দের সঙ্গে । আদি অধিবাসীদের সহজ-সরল অকপট মননরীতি ও জীবনধারায় প্রাণের স্পর্শ পেয়েছিলেন, আকৃষ্ট করেছিল তাঁকে। এ দিয়েই তিনি মুখ্যধারার তথাকথিত আভিজাত্য ভেঙে প্রান্তিক ও উপেক্ষিত মানুষের সঙ্গে মানবতাবাদের ভিতের উপর প্রীতির সেতু রচনা পথ দেখিয়ে গিয়েছিলেন,  যা আজও অনেকের উপলব্ধিতে আসে না।

সামগ্রিকভাবে বীরসিংহের গ্রামবাংলার জীবনে, কোলকাতা নগরীর বিদেশি আধিপত্য,  রক্ষণশীল ও চতুর নাগরিক সমাজে  এবং কার্মাটরের প্রান্তিক মানুষের মধ্যে  নতুন যুগের মানুষ তৈরির আমৃত্যু কর্মযোগী ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যথার্থই আধুনিক ভারতীয় সমাজে ‘সবার উপরে মানুষই সত্যে’র উপাসক ও বিজ্ঞানমনস্ক মানবতাবাদী ভাবনার পথিকৃৎ হিসেবে আমাদের সামনে আজও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। কিন্তু তাঁর শুরুকরা কর্মযোগের অসম্পূর্ণতা আজও এই স্বাধীন দেশে নতুন নতুন প্রান্তিকমানুষের জন্ম দিচ্ছে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আবর্তে অতীতের প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও এই অগণিত অর্থনৈতিক ও উপেক্ষিত সঙ্কট জর্জরিত প্রান্তিক মানুষ। যেন তিনিই মানবদরদী নতুন মানুষ তৈরির আহ্বান জানাচ্ছেন, সক্রিয়ভাবে সাড়া দেওয়াই হবে স্মরণের তাৎপর্য

শিক্ষাসংস্কারে বাংলাভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলে তিনি মাতৃভাষার বিপন্নতা রক্ষা ও তার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করে ভাষা-উন্নয়নের একটি দৃষ্টিভঙ্গী আমাদের সামনে রেখে গিয়েছেন। আজকের প্রেক্ষাপটে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁকে স্মরণ করে সেই বিষয়ে দু-একটি বিষয় আপনাদের সামনে উপস্থিত করব।

 

উৎস:

ভট্টাচার্য্য রামকৃষ্ণ। বিদ্যাসাগর নানা প্রসঙ্গ। চিরায়ত প্রকাশন। ২০১১।

ইন্দ্রমিত্র। করুণাসাগর বিদ্যাসাগর। আনন্দ। ২০১৬।

15-09-20

দুমকার জেলা প্রশাসন বাংলা ভাষার পরিসংখ্যান লোপাট করেছে

 দুমকার জেলা প্রশাসন বাংলা ভাষার পরিসংখ্যান লোপাট করেছে

 

দুমকা : বিধানসভা উপ নির্বাচনে দুমকা জেলার ভাষা পরিসংখ্যান নিয়ে জেলা প্রশাসনের ভাষার রাজনীতি নিয়ে রাজ্যের একটি ভাষা সংগঠন সোচ্চার হয়েছে। জেলার জাতীয় তথ্য প্রযুক্তি কেন্দ্র নিজের প্রোফাইলে দুমকার ভাষা হিন্দি ও সাঁতালি দেখান হয়েছে। জেলার সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগন বাঙালি ও বাংলা ভাষী। জামা, জারমুন্ডি, রামগড়, সরয়াহাট ব্লকের গ্রামাঞ্চলে খোরটা প্রধান ভাষা। রাজ্য মন্ত্রী মণ্ডলের ২০১১ র বৈঠকে বাংলা, সাঁতালি ও খোরটা ভাষা’কে দ্বিতীয় সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। নভেম্বর ২০১১ ঝাড়খন্ড গেজেটে ঐ নোটিফিকেশন টি প্রকাশ করা হয়েছে। এন আই সির রিপোর্টে দুমকা জেলার সূচনা প্রকাশ করে বাংলা ও খোরটা ভাষার উল্লেখ না করে ওই জাতি গোষ্ঠীর অপমান করা হয়েছে । ১৯৩২ সালের অন্তিম সার্ভে রেকর্ডে জেলার বিভিন্ন মৌজার নকশা ও পর্চা বাংলা ভাষায়। এখনো রেজিস্ট্রি অফিসে বাংলা ভাষায় দলিল লেখা চালু আছে। জেলা প্রশাসন উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে বাংলা ভাষার পরিসংখ্যান লোপাট করেছে। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা সমিতির স্টেট সেক্রেটারি গৌতম চট্টোপাধ্যায় উপ নির্বাচনের দিন ধার্য হওয়ার অনেক আগে মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সরেনের কাছে এন আই সির রিপোর্টে বাংলা ভাষা’কে অন্তর্ভুক্ত করার দাবী করেছে। তবে মুখ্যমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর দলের হেভিওয়েট বাঙালি নেতারা মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন।

ঝাড়খন্ড বঙ্গভাষী জাগরণ: শারদ অর্ঘের ১৯ তম সংখ্যার উন্মোচন

 ঝাড়খন্ড বঙ্গভাষী জাগরণ: শারদ অর্ঘের ১৯ তম সংখ্যার উন্মোচন

 


 


দুমকা, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা সমিতি, ঝাড়খণ্ডের পক্ষ থেকে মহা সপ্তমীর দিন শুক্রবার ৬ কার্তিক ইং ২৩ অক্টোবর ২০২০ ঝাড়খন্ড বঙ্গ ভাষী জাগরণের শারদ অর্ঘের ১৯ তম সংখ্যার উন্মোচন করা হবে। ভারত সেবাশ্রম সংঘের দুমকা শাখার স্বামী প্রণবা নন্দ বিদ্যামন্দির আবাসিক বিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিক রূপে পত্রিকার উম্মোচন করা হবে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন জ্ঞান বিজ্ঞান সমিতির জাতীয় সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ড. কাশী নাথ চ্যাটার্জি, বিশিষ্ঠ লেখক অজিত রায়, আশ্রমের স্বামী নিত্যব্রতা নন্দ মহারাজ ও সমিতির স্টেট সেক্রেটারি গৌতম চট্টোপাধ্যায়। পত্রিকার মুদ্রণ এর কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। করোনা সংক্রমণের ভয়াবহতার মধ্যে মোহাম্মদ বাজারের মন্ডল প্রেসে চলছে বাইন্ডিং এর কাজ। পত্রিকার  কাভার পেজে ঝাড়খন্ড বঙ্গ ভাষী জাগরণ পত্রিকার ১৮ তম সংখ্যার উন্মোচন ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ এর অনুষ্ঠানে ফটো ছাপা হয়েছে। ২১ ফেব্রুয়ারি র অনুষ্ঠানে বিহার বাঙালি সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুনির্মল দাস, নিখিল ভারত বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ এর বিপুল গুপ্ত, পশ্চিম বর্ধমান জেলার আসনসোলের ভাষা সৈনিক ভুদেব মুখোপাধ্যায় ও সাহেবগঞ্জের কর্মকর্তা হিমাংশু শেখর গুহ’কে সম্মানিত করা হয়। পত্রিকায় ওই ফটো গুলি প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন - গৌতম চট্টোপাধ্যায়, দুমকা

Tuesday, October 13, 2020

পুজোর বার্তা: অজয় কুমার দত্ত, জামালপুর

 পুজোর বার্তা

--------------!-!------

অজয় কুমার দত্ত, জামালপুর

আকাশ জুড়ে ওই যে সাদা

ভাসছে মেঘের ভেলা,

মাঠে-ঘাটে ঢেউ খেলে যায়

 কাশফুল এরই মেলা!


' আয়রে ছুটে আয় পুজোর গন্ধ এসেছে"

অন্তরার এই গানেতে হৃদয় নেচেছে!

পরছে মনে কত কথা

কত নতুন গান,

শিশির ভেজা সবুজ ঘাসে

জাগছে নতুন প্রাণ!

কিন্তু এবার পুজো অন্যরকম

 নেইকো খুশির বন্যা,

কানটি পেতে যাচ্ছে শোনা

 সব হারাদের কান্না!


 তা ধিন ধিন ঢাকের তালে

 নাচবে না আর কেউ,

খুশির পালে লাগল এবার

 নীরব ব্যথার ঢেউ!


 তবু সবাই ভালো থেকো

 রইলো আমার প্রীতি,

 জীবনেতে হার মেনো না

থাকুক হাজার ভীতি!



দ্বিশতজন্মবর্ষ পূর্তিতে শিক্ষাগুরু বিদ্যাসাগর স্মরণে: অম্বিকেশ মহাপাত্র

 দ্বিশতজন্মবর্ষ পূর্তিতে শিক্ষাগুরু বিদ্যাসাগর স্মরণে

অম্বিকেশ মহাপাত্র

 


সারাবিশ্বের মানুষ প্রায় ৬৫০০টি ভাষায় নিজের ভাব প্রকাশ করেন অর্থাৎ কথা বলেন। তারমধ্যে ‘বাংলা’ ভাষায় ভাব প্রকাশ করেন প্রায় ২৬.১ কোটি বিশ্ববাসী। চীনা ভাষায় কথা বলা মানুষের সংখ্যা সবচাইতে বেশী, সেখানে ‘বাংলা’ ভাষার স্থান অষ্টম! আমাদের প্রিয় দেশ বহু ভাষাবাসীর দেশ, বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান, সেটাই আমাদের গর্ব। সকল ভারতবাসী প্রায় ১২১টি ভাষায় তাঁদের মনের ভাব প্রকাশ করেন। হিন্দি ভাষায় কথা বলা মানুষের সংখ্যা সর্বাধিক, সেখানে ‘বাংলা’ ভাষার স্থান দ্বিতীয়! প্রায় ৯.১ কোটি ভারতবাসী ‘বাংলা’ ভাষাতে কথা বলেন। আমাদের দেশের কাঠামো যুক্তরাষ্ট্রীয়। দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কেন্দ্র এবং রাজ্যস্তরে মোট ২২টি ভাষা সরকারি কাজে ব্যবহৃত হয়। ‘বাংলা’ ভাষা তাদের মধ্যে অন্যতম। ‘বাংলা’ ভাষা আমাদের পড়শী দেশের জাতীয় ভাষা। দেশবাসীর মায়ের ভাষার নামেই পড়শী দেশের নাম, বাংলাদেশ। দেশ ভাগ সহ ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির আগে অধুনা বাংলাদেশ (পূর্বনাম পূর্ববঙ্গ) পশ্চিমবঙ্গ সহ বঙ্গদেশ আমাদের দেশ ভারতবর্ষের অঙ্গই ছিল। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ জন ছাত্র (সালাম, বরকত, রফিক, জব্বর এবং সফিকুর) নিজ মায়ের ভাষা, ‘বাংলা’ ভাষার মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্রশক্তির গুলিতে শহীদের মৃত্যুবরণ করেছেন। সেকারণে মাতৃভাষা স্মরণে ২১শে ফেব্রুয়ারী বাংলাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দিবস, ‘ভাষা শহীদ দিবস’ হিসেবে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে। পরবর্তী সময়ে UNESCO সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় ২০০০ সাল থেকে ২১শে ফেব্রুয়ারী সারা বিশ্বে প্রতিটি মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

আমার মায়ের ভাষা ‘বাংলা’। সকল মানুষের সুখ-দুঃখের আধার বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবি ঠাকুরের ভাবনা ও উপলব্ধিতে ‘মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধসম’। অর্থাৎ মায়ের ভাষা মায়ের দুধের সমান। প্রাথমিকস্তরে শিশুর জীবনধারণের একমাত্র খাদ্য মায়ের দুধ, শিশুর একমাত্র প্রতিষেধক মায়ের দুধ। শিশু মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর সুতীব্র চিৎকারে তার নিরাপত্তার দাবী জানায়। গর্ভধারিণী মা শিশুকে কোলে নিয়ে দুগ্ধপানের মাধ্যমে একাত্মতা সহ নিরাপত্তা দেন। শিশু মায়ের কোলে নিরাপদ আশ্রয়ে দুগ্ধপানে আনন্দানুভূতি খুঁজে পায়। পরবর্তী সময়ে শিশু মায়ের নিরাপত্তা বেষ্টনীতে থেকে মায়ের এগিয়ে দেওয়া ‘বর্ণপরিচয়’ মাধ্যমে মায়ের ভাষার বর্ণ/ অক্ষর চেনা শুরু করে এবং পাশাপাশি শিক্ষাঙ্গনে প্রবেশের ছাড়পত্র অর্জন করে। বাংলা ভাষার সেই ‘বর্ণপরিচয়’ প্রণয়ন করেছেন পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০২০ পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দ্বিশতজন্মবর্ষ পূরণ হল। ঈশ্বরচন্দ্র ঊনবিংশ শতকে অমানবিক এবং তীব্র কুসংস্কারাচ্ছন সময়কালে কুসংস্কারমুক্ত মানবিক সমাজের জন্য আন্দোলন গড়ে তুলে ছিলেন। বিশেষ করে ঈশ্বরচন্দ্র মায়েদের অসহায় অবস্থার স্থায়ী সমাধানে মেয়েদের জন্য শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলন, বহু বিবাহ রদ এবং বিধবা বিবাহ চালু করতে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন এবং আন্দোলন গড়ে তোলেন।

পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র আমার প্রথম শিক্ষাগুরু। শুধু আমারই কেন? আমাদের জাতীর শিক্ষাগুরু। জাতির শিক্ষাগুরু বিদ্যাসাগরকে স্মরণে রাখার উদ্যাগে বিদ্যাসাগরের নামে একাধিক বিদ্যালয়, একাধিক মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, উদ্যান, রাস্তা, প্রেক্ষাগৃহ, সেতু, মূর্তি, সমবায় ব্যাঙ্ক, প্রতিষ্ঠান, পুরস্কার প্রচলিত রয়েছে। বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ আমাদের অক্ষর জ্ঞান সহ ‘বাংলা’ ভাষা শিক্ষার প্রথম সোপান। যা পরবর্তী সময়ে নতুন নতুন জ্ঞান অন্বেষণে আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। এই প্রেক্ষিতে অত্যাধুনিক ই-বিশ্বে দ্বিশতজন্মবর্ষ পূর্তিতে বিদ্যাসাগরকে নতুনভাবে স্মরণের তোড়জোড়। তারই প্রাক্কালে আমাদের বাংলার রাজধানী তথা দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী কলকাতা মহানগরে ঈশ্বরচন্দ্র প্রতিষ্ঠিত বিদ্যাসাগর কলেজ প্রাঙ্গনে বিদ্যাসাগরের মূর্তি দুষ্কৃতকারীদের সংগঠিত উদ্যোগে রাস্তায় আছাড় মেরে ভেঙ্গে ফেলে উল্লাস! তারসঙ্গে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চাপান উতোর! বাঙালির হৃদয় আজ রক্তাক্ত ক্ষত-বিক্ষত। জল্লাদ বাহিনী তা জানে না, মূর্তি ভেঙ্গে উল্লাস করে বিদ্যাসাগরের চিন্তা, ভাবনা, সৃষ্টকর্মকে মুছে ফেলা যায় না! আমাদের মায়ের ভাষার বর্ণ পরিচয়ের পথিকৃৎ ধূলায় গড়াগড়ি যাচ্ছে দেখে শুধু কষ্ট পাওয়া নয়, শুধু ধিক্কার নয়, শুধু আক্ষেপ নয়, আসুন আমরা সকলে মিলে বিদ্যাসাগরকে অধিকতর মর্যাদার সঙ্গে স্মরণ করি। তার মধ্যদিয়ে শুধু বিদ্যাসাগরকে নয়, ‘বাংলা’ ভাষা তথা মায়ের ভাষা তথা আমাদের মাকে শ্রদ্ধা জানাতে পারবো।   

১৮২০ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর অধুনা পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে দরিদ্র কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবারে ঈশ্বরচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মাতা ভগবতী দেবী। ৯ বছর বয়সে গ্রামের শিক্ষা সাঙ্গ করে উচ্চ শিক্ষালাভের জন্যে বাবার সঙ্গে কলকাতায় চলে আসেন। বাবা অল্প মাহিনের চাকুরীর কাজে কলকাতায় অপরের বাড়িতে থাকতেন। ঈশ্বরচন্দ্র বাবার সঙ্গে থেকে সংস্কৃত কলেজে পড়াশোনা শুরু করেন। ঈশ্বরচন্দ্র অপরের বাড়ির গৃহস্থালির কাজকর্ম এবং ফাইফরমাস খেটেও লেখাপড়া চালিয়ে যান। আলোর অভাবে ঈশ্বরচন্দ্রকে রাস্তার আলোয় পড়াশোনা করতে হয়েছে। এই রকমের দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে পড়াশোনায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন এবং অনেকগুলি শিক্ষাবৃত্তি অর্জন করেন। সংস্কৃত, ব্যাকরণ, সাহিত্য, অলঙ্কার শাস্ত্র, বেদান্ত, স্মৃতি প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞানার্জন করেন। সেকারণে শিক্ষিত মহল ঈশ্বরচন্দ্রকে একাধারে ‘পন্ডিত’ অপরপক্ষে বিদ্যার সাগর অর্থাৎ ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিতে ভূষিত করেন। সেই থেকে ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ‘পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর’ হিসেবে জনমনে পরিচিত হয়ে আছেন।

ঈশ্বরচন্দ্র পেশাগত কর্মজীবনে শিক্ষক এবং শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্বে থেকে শিক্ষা প্রসারে এবং সমাজ সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। মাতৃভক্ত ঈশ্বরচন্দ্র মায়ের ইচ্ছে পূরণে এবং মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনস্বরূপ নারী-শিক্ষা প্রসারে প্রথম মেয়েদের জন্য স্কুল স্থাপন করেন; বীরসিংহ গ্রামে, কলকাতা এবং পার্শ্ববর্তী জেলাগুলিতে। ঈশ্বরচন্দ্র চেয়েছিলেন ছেলেদের সঙ্গে মেয়েরাও লেখাপড়া করুক। মেয়েদের শিক্ষার আলোকে না এনে, অন্দরমহলে আটকে রাখলে, সমাজের কল্যাণ হতে পারে না। সেকারণে অমানবিক ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন- কুলীন অর্থাৎ বহু বিবাহ তথা বাল্য বিবাহ প্রথার বিরুদ্ধে সরব ছিলেন। সমাজে অমানবিক অবজ্ঞার শিকার বাল্য বিধবাদের পুনর্বিবাহের জন্য, রক্ষণশীল হিন্দু সমাজপতিদের তীব্র বিরোধীতা সত্ত্বেও, লর্ড ডালহৌসির নেতৃত্বে ব্রিটিশ শাসকদের দিয়ে ‘১৮৫৬ সালে হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন’ প্রণয়ন করিয়েছিলেন। এবং নিজের একমাত্র সন্তান নারায়ন চন্দ্রের সঙ্গে বিধবার বিয়ে দিয়েছিলেন। রক্ষণশীল সমাজপতিদের প্রতি পদক্ষেপে তীব্র বাধাদান সত্ত্বেও স্পর্ধিত, ব্যতিক্রমী, অনন্য বিদ্যাসাগর কুসংস্কারমুক্ত সমাজ গঠনে আজীবন প্রয়াসী ছিলেন। সেই সময়কালে সমাজ সংস্কারের কাজ সহজ ছিল না। একদিকে পরাধীনতার শৃঙ্খল, অপরদিকে রক্ষণশীল সমাজপতিদের দাপট। তৎকালীন সমাজে খ্যাতকীর্তি প্রতিভারও অতুলনীয় সমাবেশ ঘটেছিল। রাজা রামমোহন রায়, ডেভিড হেয়ার, হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও, প্রভৃতি সমাজ সংস্কারক বাংলায় নবজাগরণ যুগের সূচনা করেছিলেন এবং এগিয়ে নিয়ে গেছিলেন। সেই বাংলায় নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের বিশ্লেষণে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। একাধারে দয়ারসাগর এবং অপরদিকে করুণাসাগর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ শাসকরা শুধু নয়, রক্ষণশীল সমাজপতিরাও সমীহ করে চলতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু স্বাধীন ভারতে জাতীর শিক্ষাগুরুর দ্বিশততম জন্মবর্ষ পালনের প্রাক্কালে বাংলায় শুধু শিক্ষাগুরুর মূর্তি আক্রান্ত হচ্ছে তাই নয়, শিক্ষার অঙ্গন সহ সমগ্র শিক্ষক সমাজকে নানানভাবে আক্রান্ত হতে হচ্ছে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উপর রাষ্ট্রের পুলিশ রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে আলো নিভিয়ে বর্বরোচিত কায়দায় আক্রমণ করছে, শিক্ষকদের বিনা অপরাধে গ্রেফতার করে হাজতে নিক্ষেপ করছে। তাই শিক্ষাগুরুর দ্বিশতজন্মবর্ষ পূর্তিতে নানান কর্মসূচি পালনের সঙ্গে শিক্ষক এবং শিক্ষার মর্যাদা ফিরিয়ে আনার শপথগ্রহণ করতে হবে। তার মধ্যদিয়ে জাতীর শিক্ষাগুরু পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর স্মরণ সার্থক হবে এবং শিক্ষাগুরুর ঋণ শোধ সম্ভব হবে।   

প্রসঙ্গক্রমে বিদ্যাসাগর সম্পর্কিত দুটি তথ্য উল্লেখের মাধ্যমে আমার শ্রদ্ধাজ্ঞাপন।

এক যে ছিল বিদ্যাসাগর

পূর্ণেন্দু পত্রী

 

এক যে ছিল বিদ্যাসাগর

ভীষণ বাজে লোক

বলতো কিনা বিধবাদের

আবার বিয়ে হোক?

 

এক যে ছিল বিদ্যাসাগর

দেখতে এলেবেলে

চাইতো কিনা লেখাপড়া

শিখুক মেয়ে, ছেলে?

 

এক যে ছিল বিদ্যাসাগর

দেমাকধারী ধাত্

সাহেব যদি জুতো দেখায়

বদলা তৎক্ষণাৎ।

 

এক যে ছিল বিদ্যাসাগর

বুদ্ধিসুদ্ধি কই?

লিখেই চলে লিখেই চলে

শিশুপাঠ্য বই!

 

এক যে ছিল বিদ্যাসাগর

কপালে তার গেরো

ওষুধ দিয়ে বাঁচায় কিনা

গরীব-গুর্বোদেরও!

 

এক যে ছিল বিদ্যাসাগর

মগজটা কি ফাঁকা?

যে যেখানে বিপন্ন তাঁর

জোগানো চাই টাকা?

 

 

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘চারিত্র পূজা’ শীর্ষক প্রবন্ধ সংকলনে এই মনীষী সম্পর্কে লিখেছেন- ‘বিদ্যাসাগর এই বঙ্গদেশে একক ছিলেন। এখানে যেন তাঁহার স্বজাতি সোদর কেহ ছিল না। এ দেশে তিনি তাঁহার সমযোগ্য সহযোগীর অভাবে আমৃত্যুকাল নির্বাসন ভোগ করিয়া গিয়াছেন। তিনি সুখী ছিলেন না। তিনি নিজের মধ্যে যে এক অকৃত্রিম মনুষ্যত্ব সর্বদাই অনুভব করিতেন, চারিদিকের জনমন্ডলীর মধ্যে তাহার আসন দেখিতে পান নাই। তিনি উপকার করিয়া কৃতঘ্নতা পাইয়াছেন, কার্যকালে সহায়তা প্রাপ্ত হন নাই। তিনি প্রতিদিন দেখিয়াছেন আমরা আরম্ভ করি, শেষ করি না, আড়ম্বর করি, কাজ করি না, যাহা অনুষ্ঠান করি তাহা বিশ্বাস করি না, যাহা বিশ্বাস করি তাহা পালন করি না, ভুরি পরিমাণ বাক্য রচনা করিতে পারি, তিল পরিমাণ আত্মত্যাগ করিতে পারি না, আমরা অহংকার দেখাইয়া পরিতৃপ্ত থাকি, যোগ্যতা লাভের চেষ্টা করি না, আমরা সকল কাজেই পরের প্রত্যাশা করি, অথচ পরের ত্রুটি লইয়া আকাশ বিদীর্ণ করিতে থাকি, পরের অনুকরণ আমাদের গর্ব, পরের অনুগ্রহ আমাদের সম্মান, অপরের চক্ষে ধূলি নিক্ষেপ আমাদের পলিটিক্স ...... এই দুর্বল, ক্ষুদ্র, হৃদয়হীন, কর্মহীন, দাম্ভিক, তার্কিক জাতির প্রতি বিদ্যাসাগরের এক সুগভীর ধিক্কার ছিল।’

*****************

 

Tuesday, October 6, 2020

'বিদ্যাসাগরের দ্বিশত জন্মবার্ষিকী' উপলক্ষে আলোচনাচক্র

 

'বিদ্যাসাগরের দ্বিশত জন্মবার্ষিকী' উপলক্ষে আলোচনাচক্র

গত ৪ অক্টোবর রবিবার, আমাদের সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মন্টু ঘোষ-এর উদ্যোগে উত্তর দুর্গানগর-এর 'স্বপ্নপুরী'-র সুসজ্জিত প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় 'বিদ্যাসাগরের দ্বিশত জন্মবার্ষিকী' উপলক্ষে আলোচনাচক্র। বিষয় : 'নবযুগের দিশারি বিদ্যাসাগর'। 







বক্তা হিসাবে ছিলেন সৈকত কুণ্ডু, মিলন গাঁয়েন, ড.শতাব্দী দাশ ও শক্তি মণ্ডল। গান, নাচ, কবিতা ছিল এই আলোচনাচক্রের অন্যতম আকর্ষণ।প্রায় ৩০ জন শ্রোতা এই সভায় উপস্থিত ছিলেন। সত্যেন মৈত্র জনশিক্ষা সমিতি-র পক্ষ থেকে এই আলোচনাচক্রের সঞ্চালনা করেন মন্টু ঘোষ।

প্রতিবেদন – শক্তি পদ মন্ডল

বীতংস_ ( হাথরস স্মরণে ): আলো রায়, পূর্ণিয়া।

 

বীতংস_

 

আবরণে আঁধার মেখেছ তুমি/অন্তরালে পূর্ণিমার আলো__

ছুঁয়ে আছ মূল‍্যবোধ, রেখেছ আঁচলখানি, সন্ধ‍্যায় যদি এক দিয়াটুকু জ্বালো / কিম্বা স্নান করে নেবে বলে নদী খুঁজে ডোবালে শরীর__

ডাঙায় বাঘের নখ জলেও কুমীর!!

 

কোথায় যাবে হে মেয়ে   সাঁকো বেয়ে উঠে আসে শুয়োপোকা_

বহু নীচে উদ‍্যত খড়্গ, গণ্ডার পুরুষ_

তৈরী আছে মোমের মিছিল সান্ত্বনা তোমার _ জগতে অনেক কোলাহল,ঢেকে দ‍্যায় কাতর চিৎকার__

 

কাছেই আমরা আছি ফ্লুরোসেন্ট আলোর তলায়/ আরো কিছু শ্রোতাবন্ধু জলচোখে তেলেভাজা খায়!!

 

সাঙ্গ হয় সভা, একা একা ফিরে যায় সব।

কাছেই কোথাও,হয়তো বা শুয়ে আছে বিগত উৎসব!!!

 

( হাথরস স্মরণে )

 

আলো রায়, পূর্ণিয়া।

 বিহার বাঙালি সমিতি পূর্ণিয়া শাখার নবনির্বাচিত কমিটির প্রথম বৈঠক সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আজকের এই গুরত্বপূর্ণ সভায় উপস্থিত সকল সদস্যদের আন...